• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 6 October, 2026

বাড়ি কি শুধু চারটি দেওয়াল?

মাদ্রিদের ২৬ বছরের গ্রন্থাগারিক মার্কোস সাঞ্জের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দুই শোবার ঘরের একটি ফ্ল্যাট ভাগ করে মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন এক শোবার ঘরের ফ্ল্যাটের ভাড়াই প্রায় এক হাজার ইউরো। তাঁর আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণ না এলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের মাদ্রিদ ছেড়ে যেতে হবে।

বাড়ি কি শুধু চারটি দেওয়াল?

Photo: BBC

বাড়ি মানুষের কাছে শুধু ইট, বালি, সিমেন্ট আর চারটি দেওয়ালের সমষ্টি নয়। বাড়ি মানে স্মৃতি, নিরাপত্তা, পরিচিত গন্ধ, প্রতিবেশী, জানালার বাইরের দৃশ্য— কখনও বা একটি গোটা জীবনের ইতিহাস। তাই ৮৭ বছরের এক বৃদ্ধাকে তাঁর সাত দশকের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনা যখন একটি দেশের রাজপথে হাজার হাজার মানুষকে নামিয়ে আনে, তখন বুঝতে হয়, সমস্যাটি নিছক বাড়িভাড়ার নয়। এর গভীরে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এবং বাজারের সঙ্গে সেই অধিকারের সংঘাত।

স্পেনে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তারই বহিঃপ্রকাশ। মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ভ্যালেন্সিয়া-সহ প্রায় পঞ্চাশটি শহরে মানুষ পথে নেমেছেন। তাঁদের দাবি— বাড়িভাড়া কমাতে হবে, অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে এবং বড় বিনিয়োগ সংস্থাগুলির আবাসন ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। মাদ্রিদের রাস্তায় কেউ লিখেছেন, ‘ভাড়ার জন্য শান্তি থাকবে না।’ কেউ বলেছেন, ‘আমি পড়াশোনা করি ভবিষ্যতের জন্য, ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট পাওয়ার জন্য নয়।’ আবার কেউ হাতে বাড়ির চাবি তুলে  স্লোগান দিয়েছেন— ‘এই শহরের সব চাবি আমাদের হাতে।’

এই ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছেন মারিকারমেন আবাসকাল। ৮৭ বছরের এই বৃদ্ধা মাদ্রিদের যে বাড়িতে থাকতেন, সেখানে তাঁর বাবা প্রথম ভাড়া নিয়েছিলেন ১৯৫৬ সালে। বাবা-মা চলে যাওয়ার পরও তিনি সেই বাড়িতেই থেকেছেন। অর্থাৎ বাড়িটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিছক ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালার সম্পর্ক নয়— সাত দশকের জীবন সেখানে জমা হয়ে আছে।

কিন্তু ২০১৮ সালে বাড়িটি একটি বিনিয়োগ সংস্থার হাতে চলে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আইনের একটি ফাঁক ব্যবহার করে তাঁর মাসিক ভাড়া ৫০০ ইউরো থেকে বাড়িয়ে প্রথমে ২,৬৫০ ইউরো করা হয়। পরে তা কমিয়ে ১,৬৫০ ইউরো করা হলেও তাঁর মাসিক পেনশন ১,৩৫০ ইউরো। ফলে নতুন ভাড়া দেওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। আদালতের মাধ্যমে তিনবার উচ্ছেদ ঠেকানোর পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়।

এই ঘটনাটি স্পেনের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। উচ্ছেদের দিন শত শত মানুষ, বিশেষত তরুণেরা, বাড়িটির সামনে জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের স্লোগান ছিল— ‘মারিকামেন থাকবেন।’ শিল্পী, অভিনেতা, সমাজকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ— অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। কেউ কবিতা পড়েছেন, কেউ রাস্তায় রাত কাটিয়েছেন। এমনকি জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট কমিটিও তাঁর উচ্ছেদ স্থগিত করে সাশ্রয়ী বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধার বাড়ি রক্ষা করা যায়নি। এই ব্যর্থতা শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক।

স্পেনের আবাসন সংকটের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী, চাহিদা ও নতুন নির্মাণের ব্যবধান মেলালে প্রায় সাত লক্ষ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে। গত এক বছরে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২.২ শতাংশ। ২০২৫ সালে ভাড়ার খরচ বেড়েছে ৮.৫ শতাংশ। মাদ্রিদে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৯.৭ শতাংশ। গত দশ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বার্সেলোনা ও মাদ্রিদে প্রতি বর্গমিটারে ভাড়া এখন স্পেনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে— বাড়ি কি শুধুই একটি বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ? অর্থনীতির নিয়ম বলবে, চাহিদা বেশি হলে দাম বাড়বে। বিনিয়োগকারী বলবেন, সম্পত্তি তাঁর, তাই বাজারদর অনুযায়ী ভাড়া নেওয়ার অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু সমাজের প্রশ্নটি অন্য। একজন বৃদ্ধ মানুষ, একজন কম আয়ের শ্রমিক, একজন তরুণ ছাত্র বা একজন একক মা— তাঁরা যদি বাজারের দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পারেন, তবে তাঁদের কি শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে? একটি শহর কি কেবল তাঁদের জন্য, যাঁদের পকেটভর্তি টাকা?

মাদ্রিদের ২৬ বছরের গ্রন্থাগারিক মার্কোস সাঞ্জের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দুই শোবার ঘরের একটি ফ্ল্যাট ভাগ করে মাসে ৯০০ ইউরো ভাড়া দিতেন। এখন এক শোবার ঘরের ফ্ল্যাটের ভাড়াই প্রায় এক হাজার ইউরো। তাঁর আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণ না এলে শেষ পর্যন্ত তাঁদের মাদ্রিদ ছেড়ে যেতে হবে।

এটি শুধু স্পেনের সমস্যা নয়। পৃথিবীর বহু বড় শহরেই একই ছবি। শহর যত অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সাধারণ মানুষের জন্য সেখানে বাস করা তত কঠিন হয়ে উঠছে। বাড়ি কেনা তো দূরের কথা, ভাড়ার সামর্থ্যও ক্রমশ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আবাসন অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হয়ে উঠছে বিনিয়োগের ক্ষেত্র। বাড়ি খালি পড়ে থাকতে পারে, কিন্তু তার দাম বাড়তে থাকে। মানুষের মাথার ওপর ছাদ নেই, অথচ সম্পত্তির বাজারে মূল্য বাড়ে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্ছেদ স্থগিত রাখা, ভাড়ার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো, পর্যটন-নির্ভর ফ্ল্যাটের ওপর কর বাড়ানো এবং বড় বিনিয়োগকারীদের আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের মতো প্রস্তাব এনেছিল। কিন্তু সংসদে সেগুলি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে সরকারের রাজনৈতিক দুর্বলতাও প্রকট হয়েছে।

তবে শুধু ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সমালোচকদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত নতুন বাড়ি তৈরি না হলে সরবরাহের ঘাটতি থেকেই যাবে। আবার বাড়িওয়ালাদের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের ভয় দেখালে তাঁরা ভাড়ার বাজার থেকে বাড়ি সরিয়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ সমাধান সহজ নয়। দরকার একই সঙ্গে সাশ্রয়ী বাড়ি নির্মাণ, সামাজিক আবাসন বৃদ্ধি, ভাড়াটেদের নিরাপত্তা এবং আবাসনকে নিছক জল্পনামূলক বিনিয়োগে পরিণত হওয়া থেকে আটকানোর ভারসাম্যপূর্ণ নীতি।

কিন্তু নীতির হিসাবের বাইরে একটি মানবিক সত্য ভুলে গেলে চলবে না। মারিকামেনের মতো একজন বৃদ্ধার কাছে তাঁর বাড়ির মূল্য বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি। সেখানে তাঁর শৈশবের স্মৃতি, বাবা-মায়ের স্মৃতি, তাঁর নিজের জীবনের সাত দশক। সেই বাড়িকে কেবল একটি ‘অ্যাসেট’ হিসেবে দেখা যায় না।

একটি সভ্য সমাজের সাফল্য কেবল তার বাড়ির দাম কত বাড়ল, তা দিয়ে মাপা যায় না। বরং দেখতে হয়, সেই শহরে একজন বৃদ্ধা তাঁর পরিচিত বাড়িতে শেষ জীবন কাটাতে পারেন কি না; একজন তরুণ তাঁর উপার্জনের মধ্যে নিরাপদ বাসস্থান পান কি না; একজন শ্রমিক কাজের জায়গার কাছাকাছি থাকতে পারেন কি না।

স্পেনের রাস্তায় যে ক্ষোভ আজ শোনা যাচ্ছে, তার আসল প্রশ্ন তাই খুব সরল— শহর কার? বাজারের, না মানুষের? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু স্পেনকে নয়, আগামী দিনের পৃথিবীর বহু শহরকেই দিতে হবে।