সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে সমাজমাধ্যমের নানা প্ল্যাটফর্মে কারও কোনও মতামত পছন্দ না হলে সেখানেই একে অপরকে গালিগালাজ করছে। তাও আবার জাতপাত তুলে চলছে তুমুল গালিগালাজ। সেটা সকলে দেখতেও পাচ্ছেন। এবার এমনই একটি মামলা এল কলকাতা হাইকোর্টে। সমাজমাধ্যমে জাতপাত নিয়ে অশালীন এবং কুরুচিকর মন্তব্য করলেও আইনি পথে তার শাস্তি হবে বলে আইন মনে করিয়ে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। সুতরাং এসব করে কোনওভাবেই যে বাঁচা যাবে না সেটাও জানিয়ে দেওয়া হয়। শুধু সামনাসামনি গালিগালাজ করলেই তা অপরাধ, সমাজমাধ্যমে করলে তা অপরাধ নয়, বিষয়টি যে তেমন নয় তা সরাসরি জানিয়ে দিল কলকাতা হাইকোর্ট।
কলকাতা হাইকোর্ট সূত্রে খবর, এক ব্যক্তি দু’জনের বিরুদ্ধে জাতিপাত তুলে গালিগালাজ করার অভিযোগ নিয়ে আসেন। এই জাতপাত তুলে সমাজমাধ্যমে গালাগাল করার জেরে অপমানিতবোধ করেন তিনি। তাই এই অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন। পুলিশ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে পড়ে। আর রিপোর্টও দেয়। কিন্তু যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে তাতে কোনও অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি। এই ঘটনায় অপমানিত ব্যক্তি আদালতের দ্বারস্থ হন। তবে পুলিশের ওই যুক্তি যে খাটবে না এবার সেটা বুঝিয়ে দিল কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি উদয় কুমারের বেঞ্চ।
আলিপুরের বিশেষ আদালত পুলিশের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের ২৭ জুন অভিযোগকারীর আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর নিম্ন আদালতের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিলেন আবেদনকারী। আবেদনকারীর অভিযোগ ছিল, রবিউল ইসলাম বুলবুল এবং সায়ন দত্ত নামে দু’জনের বিরুদ্ধে। সমাজমাধ্যমে ওই দু’জন তাঁর জাতিগত পরিচয়, ধর্ম, এবং পরিবার সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ, জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেছেন। এই অভিযোগ তোলার সঙ্গে তিনি সমাজমাধ্যমে করা পোস্টগুলির স্ক্রিনশটও জমা দেন। তার ভিত্তিতে বেহালা থানায় এসসি-এসটি আইনের ৩(১)(আর)/(এস) ধারায় মামলা হয়।
তাছাড়া তদন্ত চলাকালীন পুলিশ অভিযোগকারীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছিল। স্ক্রিনশট এবং সমাজমাধ্যমের লিঙ্কের তালিকা তৈরি করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশ একটি নো ক্লু রিপোর্ট দেয়। কলকাতা পুলিশের দাবি, তারা সাইবার সেকশনের মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ব্যবহারকারীদের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পায়নি। বিশেষ আদালত এই কথা শুনে আবেদন খারিজ করে দেয়। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ, যেখানে ডিজিটাল স্ক্রিনশট এবং লিঙ্ক আছে ও জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে, সেখানে ফেসবুক থেকে তথ্য না পাওয়ায় পুলিশ মামলা গুটিয়ে নিতে পারে না। বরং এসসি/এসটি আইনের ৩(১)(আর)/(এস) ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমেও জাতিগত অপমানের অভিযোগে মান্যতা দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের যুক্তি মান্যতা দেয়নি কলকাতা হাইকোর্ট। বরং কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি উদয় কুমার বলেন, ‘মেটা বা ফেসবুকের কাছ থেকে তথ্য না পাওয়ার পর তদন্ত থেমে যাওয়া উচিত হয়নি। আইপি লগ ও অন্যান্য বিষয় খুঁজে দেখা দরকার ছিল। পর্যাপ্ত ডিজিটাল উপাদান থাকা সত্ত্বেও সাইবার সেলকে দিয়ে তদন্ত না করানোর জেরে বিভ্রাট তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যমে এভাবে জাতিগত অপমানের অভিযোগকে গুরুত্বহীন মনে করা যায় না।’ এরপরই বিচারপতি উদয় কুমার ২০২৩ সালের ২৭ জুনের নির্দেশ বাতিল করে দেন। আর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং প্রোফাইল লগ শনাক্ত করে তিন মাসের মধ্যে সিআরপিসির ১৭৩(৮) ধারায় রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।




