একটি আদালতের রায় সাধারণত আইনের ভাষায় লেখা হয়। সেখানে থাকে অপরাধের বিবরণ, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইনের ধারা এবং সাজা ঘোষণার যুক্তি। কিন্তু কখনও কখনও সেই কঠিন আইনি ভাষার মধ্যেও মানুষের হৃদয়ের স্পর্শ এসে লাগে। সম্প্রতি ভারতের এক বিচারকের লেখা একটি চিঠি তেমনই দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। চিঠিটি লেখা হয়েছে যৌন নির্যাতনের শিকার দশ বছরের একটি শিশুকে। সেই চিঠিতে বিচারক শুধু অপরাধীর সাজা ঘোষণা করেননি, শিশুটির সাহসকে সম্মান জানিয়েছেন এবং তাকে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বাঁচার আহ্বান জানিয়েছেন।
ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই শিশুটির বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে যৌন নির্যাতন করে। পরে শিশুটি মাকে সব কথা জানায়। সেই সাহসী পদক্ষেপই তাকে বিচারের পথে নিয়ে আসে। বিচারক রজনী রঙ্গা রায়ের শেষে শিশুটিকে সম্বোধন করে লেখেন— ‘প্রিয় শিশু’, এবং তাকে এই আদালতে দেখা ‘সবচেয়ে সাহসী ছোট্ট মেয়ে’ বলে অভিহিত করেন।
বিচারক শিশুটির একটি কথাও মনে রেখেছিলেন। শিশুটি বলেছিল, ‘যতদিন আঙ্কল বুড়ো না হয়ে যায়, ততদিন তাঁকে জেলে রাখা হোক।’ আদালত সেই আবেদন শুনেছে। দোষী ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তাকে জীবনের বাকি সময় জেলেই থাকতে হবে। শিশুটির জন্য সাড়ে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণও নির্ধারণ করা হয়েছে।
রায়ের শেষে বিচারক লিখেছেন, ওই ব্যক্তি আর কখনও মুক্ত মানুষ হিসেবে বাইরে বেরোতে পারবে না। সে জেলে বৃদ্ধ হবে, জেলেই তার জীবন শেষ হবে। সে আর ওই শিশুটির, তার ছোট বোনের কিংবা অন্য কোনও শিশুর ক্ষতি করতে পারবে না। বিচারক আরও বলেছেন– শিশুটি আদালতে এসে, যে মানুষটি তাকে আঘাত করেছে, তাকে চিনিয়ে দিয়েছে এবং সত্য কথা বলেছে— এটাই তার বড় সাহস।
এই কথাগুলির গুরুত্ব শুধু আবেগে নয়, সামাজিক অর্থেও গভীর। কারণ যৌন নির্যাতনের শিকার একটি শিশু শুধু একটি মামলার সাক্ষী নয়। তার সামনে থাকে দীর্ঘ এক মানসিক লড়াই। অপরাধের স্মৃতি, ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, সামাজিক চাপ— সব মিলিয়ে তার শৈশব অনেক সময় স্বাভাবিক পথে এগোতে পারে না। বিচারকের চিঠির সবচেয়ে মানবিক অংশটি সম্ভবত সেখানেই। তিনি বলেছেন, আদালত শিশুটির হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু এখন তাকে জীবনকে ফিরে পেতে হবে— স্কুলে যেতে হবে, বন্ধু তৈরি করতে হবে, হাসতে হবে, খেলতে হবে, স্বপ্ন দেখতে হবে।
আইনের বিচারের পাশাপাশি এই মানবিক আশ্বাসও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— একজন বিচারকের এমন চিঠি কেন এত মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে? সম্ভবত কারণ, আমাদের সমাজে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু ও নারীরা অনেক সময় অপরাধের পাশাপাশি সামাজিক নীরবতারও শিকার হন। তাঁদের প্রশ্ন করা হয়, কেন তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, কেন আগে বলেননি, কেন প্রতিরোধ করেননি, এমনকি তাঁদের পোশাক বা আচরণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অথচ অপরাধের দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যে মানুষটি শিশুটিকে নির্যাতন করেছিল, সে তার কাছে অপরিচিত কেউ ছিল না। তাকে শিশুটি ‘আঙ্কল’ বলে চিনত। যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনায় অপরাধী পরিচিত মানুষ— আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচর্যাকারী, শিক্ষক, বন্ধু বা পরিবারের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। শিশুর কাছে যে মানুষটি নিরাপদ বলে মনে হয়, কখনও কখনও সেই মানুষই তার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শুধু অপরিচিত মানুষের বিপদ সম্পর্কে শিশুদের সতর্ক করলেই দায় শেষ হয় না। তাদের শরীর, ব্যক্তিগত সীমা এবং অস্বস্তিকর আচরণ সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে কোনও ঘটনা ঘটলে ভয় না পেয়ে মা-বাবা বা বিশ্বাসযোগ্য বড়দের বলতে পারে।
ভারতে বালিকা থেকে নারী— জীবনের বিভিন্ন পর্যায়েই যৌন হেনস্থার আশঙ্কা বাস্তব। বাড়ি, স্কুল, কর্মক্ষেত্র, রাস্তা, গণপরিবহন, এমনকি পরিচিত সামাজিক পরিসরেও নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালেই দেশে পকসো আইনের অধীনে ৬৯ হাজারের বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে সরকারি অপরাধ-পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু নথিভুক্ত সংখ্যাই যে প্রকৃত ঘটনার সম্পূর্ণ ছবি নয়, সেটিও মনে রাখা দরকার। সামাজিক লজ্জা, পরিবারের চাপ, অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক, পুলিশের কাছে যাওয়ার ভয় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা— এসব কারণে অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না।
এই বাস্তবতা বদলাতে শুধু কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়। অবশ্যই অপরাধীর শাস্তি হওয়া জরুরি, কারণ শাস্তিহীনতা অপরাধীর সাহস বাড়ায়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন দ্রুত ও সংবেদনশীল তদন্ত, শিশুবান্ধব আদালত, ভুক্তভোগীর মানসিক সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ এবং পরিবারের সচেতনতা। বিদ্যালয়গুলিতেও শিশুদের নিরাপত্তা ও ‘গুড টাচ, ব্যাড টাচ’ নিয়ে বয়সোপযোগী শিক্ষা আরও কার্যকরভাবে চালু করা দরকার। মেয়েদেরই শুধু সাবধান হতে বলা নয়— ছেলেদেরও ছোটবেলা থেকে সম্মতি, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সীমার শিক্ষা
দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, যৌন নির্যাতনের শিকার কোনও শিশুকে তার পরিচয় দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে না। সে ‘নির্যাতিতা’ পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকবে না। সে একজন পূর্ণ মানুষ— তার ভবিষ্যৎ আছে, স্বপ্ন আছে, আনন্দ পাওয়ার অধিকার আছে।
বিচারক রজনী রঙ্গার চিঠিটি তাই শুধু একটি মামলার অংশ নয়। এটি বিচারব্যবস্থার মানবিক মুখের একটি স্মরণীয় উদাহরণ। শিশুটিকে তিনি বলেছেন— জীবনকে বেছে নিতে, স্কুলে যেতে, খেলতে, হাসতে এবং স্বপ্ন দেখতে। এই কথাগুলি শুধু ওই শিশুটির জন্য নয়; আমাদের সমাজের জন্যও এক গভীর বার্তা।
একটি শিশুর সাহস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়— নীরবতা ভাঙা কত গুরুত্বপূর্ণ। আর সমাজের দায় হল সেই সাহসকে রক্ষা করা। এমন একটি ভারত গড়ে তোলা, যেখানে কোনও শিশুকে তার নিরাপত্তার জন্য ভয় পেতে হবে না, কোনও নারীকে নিজের স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে অপমান সহ্য করতে হবে না এবং অপরাধের বোঝা কখনও ভুক্তভোগীর কাঁধে চাপানো হবে না— এই লক্ষ্যেই আমাদের আইন, সমাজ ও বিবেককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।




