• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 30 September, 2026

জনগণনা ও ‘এসআইআর’ বিতর্কের মাঝেই দেশজুড়ে এনআরসি-র পক্ষে সওয়াল আরএসএসের, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

Census 2027 এবং SIR বিতর্কের আবহে ফের দেশজুড়ে National Register of Citizens (NRC) কার্যকর করার দাবি তুলল RSS। জনবিন্যাসের ভারসাম্য ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কী বললেন সঙ্ঘনেতা? রইল এক্সপ্লেইনার।

জনগণনা ও ‘এসআইআর’ বিতর্কের মাঝেই দেশজুড়ে এনআরসি-র পক্ষে সওয়াল আরএসএসের, নেপথ্যে কোন অঙ্ক?

RSS calls for nationwide NRC amid Census, SIR debate (Image: @rss.org)

জাতীয় জনগণনা (Census 2027) এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়াকে ঘিরে যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই দীর্ঘদিনের আরেক বিতর্কফের উসকে দিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)। নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কলাকেন্দ্রে (IGNCA) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সঙ্ঘের অখিল ভারতীয় প্রচার প্রমুখ সুনীল আম্বেকর স্পষ্ট ভাষায় অবিসম্বে দেশজুড়ে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (National Register of Citizens – NRC) প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের জনবিন্যাসের ভারসাম্য (Demographic Imbalance) রক্ষা এবং দেশের অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রকৃত নাগরিকদের চিহ্নিত করা জরুরি।

সঙ্ঘের যুক্তি কী?

আম্বেকর তাঁর ভাষণে জনসংখ্যার চরিত্রবদলকে নিছক সংখ্যার হেরফের হিসেবে না দেখে একটি সুদূরপ্রসারী ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সংকট’ (National Security and Cultural Issue) হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, ভোটার ও নাগরিক তালিকায় বেআইনি ভাবে প্রবেশকারীদের নাম ঢুকে যাওয়া রুখতে হবে এবং ভুল ভাবে নথিভুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে দেশজোড়া এনআরসি অপরিহার্য। সঙ্ঘের এই নেতার বক্তব্য, ভারতে জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বহু শতাব্দী আগে, মধ্যযুগে বহিরাগত আক্রমণের সময় থেকেই। বেআইনি অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার (Idea of Secularism) আড়ালে বছরের পর বছর রাজনৈতিক সুবিধার জন্য প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিবাহ ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে আম্বেকর বলেন, বহুবিবাহের কোনও অবাধ আইনি অনুমতি না থাকলেও পরবর্তীকালে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে, অথচ হিন্দুদের জন্য একাধিক বিবাহ শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। ফলে গোটা দেশে অবিলম্বে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code – UCC) কার্যকর করার পক্ষেও সওয়াল করেন তিনি।

টাইমিংয়ের তাৎপর্য

 সঙ্ঘের এই দাবির সময়কালটি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে দু’টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রের সঙ্গে বিরোধী শিবির ও আঞ্চলিক দলগুলির টানাপড়েন তুঙ্গে। ২০২৭ সালের জনগণনায় (Census 2027) জাতিভিত্তিক গণনা (Caste Enumeration) রাখা হবে কি না এবং তার প্রশ্নমালা কেমন হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে তীব্র মতপার্থক্য আছে বিরোধীদের। অন্য দিকে, মণিপুরে মেইতেই ও নাগা সংগঠনগুলির তীব্র প্রতিবাদের মুখে কেন্দ্র সম্প্রতি প্রস্তাবিত গৃহ-তালিকাভুক্তিকরণ (House-listing) পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। সেখানে আন্দোলনকারীদের সাফ দাবি, আগে ১৯৫১ সালের নথির ভিত্তিতে এনআরসি হোক, তার পর জনগণনা (NRC First) হবে।

অন্যদিকে বিহার-সহ একাধিক রাজ্যে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর-এর মাধ্যমে ঘুরপথে এনআরসি প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষের ওপর নাগরিকত্ব প্রমাণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট শর্তসাপেক্ষে কিছু নির্দেশ দিলেও বিতর্ক কমেনি। বরং আরও বড়মাপের আন্দোলনের সলতে পাকানো শুরু হয়েছে।

এই জোড়া বিতর্কের মাঝেই সঙ্ঘ নেতৃত্ব সরাসরি দেশব্যাপী এনআরসি-র পুরনো দাবি সামনে এনে স্পষ্ট করে দিল যে, নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রশ্নটিকে তারা ধামাচাপা পড়তে দিতে নারাজ।

সরকারের কোর্টে বল?

সঙ্ঘ পরিবার অতীতেও বারবার দেশজোড়া এনআরসি-র কথা বলেছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন সরকার্যবাহ সুরেশ ‘ভাইয়াজি’ যোশী এবং পরবর্তীতে ২০২১ সালে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত জানিয়েছিলেন, প্রকৃত নাগরিকদের চিহ্নিত করতেই এই আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন, এটিকে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা অনুচিত।

তবে প্রশাসনিক বাস্তবতায় কেন্দ্র এখনও জাতীয় এনআরসি-র কোনও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করেনি। কোভিড মহামারির কারণে ২০২১ সালের জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি (National Population Register – NPR) স্থগিত হওয়ার পর, ২০২৭-এর জনগণনা প্রক্রিয়ার সঙ্গেও এনপিআর বা এনআরসি নিয়ে কোনও সরকারি সিলমোহর আসেনি। ফলে সঙ্ঘের এই প্রকাশ্য চাপ মোদী সরকারকে নীতিগত ভাবে কোন দিকে চালিত করে, সেটা আপাতত দিল্লির রাজনীতিতে বড় প্রশ্ন।

পশ্চিমবঙ্গে পড়বে প্রভাব?

পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির রাজনীতিতে এনআরসি ও সিএএ (CAA) বরাবরই সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। সঙ্ঘের শীর্ষ নেতৃত্বের এই নতুন সওয়াল নিশ্চিত ভাবেই বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে তুমুল হইচই ফেলবে।