ইংলিশ ক্লাব ফুটবল এর চেয়ে বড় ধাক্কা আর কখনো খেয়েছে? বোধহয় না। তাও আবার আর্থিক কেলেঙ্কারি। প্রায় এক দশক ধরে আর্থিক নিয়ম ভেঙে আসছে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City)। এই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হল তারা। ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮—টানা ন’টি মরসুমে প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) আর্থিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগের সব ক’টিতেই তাদের দোষ ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে স্বাধীন কমিশন। পাশাপাশি তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগগুলিরও বেশির ভাগই প্রমাণিত হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘শ্যাম’ বা প্রকৃত চুক্তির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি, যাকে চলতি কথায় ভুয়ো চুক্তি বলা যায়। প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) দাবি, এই ধরনের চুক্তির মাধ্যমে সিটি (Manchester City) তাদের আয় কৃত্রিম ভাবে বাড়িয়ে এবং খরচ কমিয়ে দেখিয়েছিল। কমিশনের মতে, এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সময়ে ৯০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি (প্রায় ১.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১১,৫৪২ কোটি ভারতীয় টাকা) অঙ্কের আর্থিক হিসাব প্রভাবিত হয়েছিল।
প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) অভিযোগ, ওই সময় একাধিক বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে এমন চুক্তি করা হয়েছিল, যেখানে প্রকৃত সমঝোতার ছবি প্রতিফলিত হয়নি। পাশাপাশি ভুল হিসাব জমা দেওয়া এবং অডিটর ও ফুটবল নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র গোপন করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে, যা সবই প্রমানিত। বিবিসি জানাচ্ছে, ভুয়ো বাণিজ্যিক চুক্তিগুলিকে প্রায় ৮৩০.৬৯ মিলিয়ন পাউন্ডের ‘গোপন অর্থায়ন প্রকল্প’-র অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: কামাখ্যায় গম্ভীর, পুজো দিয়ে আশীর্বাদ নেওয়ার পর বিপক্ষ শিবির থেকে এল বড় খবর
প্রিমিয়ার লিগ (Premier League) জেতা তিনটি মরসুম—২০১১-১২, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৭-১৮—মিলিয়ে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) স্পনসরশিপ বাবদ ৩৬০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় দেখিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৪৩ মিলিয়ন পাউন্ড বৈধ ছিল। বাকি অর্থ এসেছিল ক্লাবের মালিকদের কাছ থেকে এবং তা স্পনসরশিপের অর্থ হিসেবে আড়াল করা হয়েছিল।
কমিশন জানিয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট স্পনসরশিপ চুক্তিগুলি ভুয়ো বলে প্রমাণিত হয়েছে, অথবা অন্ততপক্ষে সেগুলি চুক্তিগুলির প্রকৃত আর্থিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করেনি’। কমিশন আরও জানিয়েছে, সেখানে ছিল ‘প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে করা ইচ্ছাকৃত অথবা বেপরোয়া আচরণ’। তাদের বক্তব্য, সিটির তৈরি ওই ‘ভুয়ো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্লাবটি ‘২০০৯-১০ মরসুমে প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক মরসুমে সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি হিসাবে যা নথিভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা এড়াতে সক্ষম হয়েছিল’।
‘প্রায় এক দশক ধরে নিয়ম ভেঙেছে’
রায়ের পরে প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স বলেন, ‘এই তদন্তেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, ম্যানচেস্টার সিটি প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিক ভাবে প্রিমিয়ার লিগের নিয়ম ভেঙেছে’।
তিনি আরও বলেন, ‘এই শৃঙ্খলাজনিত মামলা এবং এই সিদ্ধান্ত প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলির মধ্যে একটি’। তবে কী শাস্তি হবে তাদের, সেই সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
সিটি যে সময়ে এই সমস্ত বেনিয়মের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছে, সেই সময়েই ইংল্যান্ডের ফুটবলে ক্লাবের দ্রুত উত্থান হয়। ২০০৮-এ আবু ধাবির মালিকানায় যাওয়ার পর ক্রমশ বড় বিনিয়োগ আসে ক্লাবে। একের পর এক তারকা ফুটবলারকে দলে এনে ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হয়ে ওঠে সিটি।
আরও পড়ুন: ইয়ামালের জোড়া গোলে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-১-এ উড়িয়ে দিল স্পেন, ১০ জনের চেকিয়াকে হারাল ইংল্যান্ড
অভিযোগ মানছে না ম্যান সিটি
তবে এই রায় মেনে নেওয়ার কোনও লক্ষণই নেই ম্যানচেস্টার সিটির (Manchester City)। ক্লাব জানিয়েছে, তারা এই সিদ্ধান্তে ‘হতাশ এবং বিস্মিত’। রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করার কথাও জানিয়েছে তারা।
ক্লাবের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আইন, নীতি এবং তথ্যের ক্ষেত্রে স্পষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভুল রয়েছে এবং সেই কারণে এই মতামত সঠিক নয়— এই ভিত্তিতে ম্যানচেস্টার সিটি এ বার আপিলের সবরকম পথই অনুসরণ করবে’।
অর্থাৎ এই অধ্যায় এখানেই শেষ হচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে শুরু হবে আপিলের লড়াই। আর তার আগে আরও একটি বড় প্রশ্ন—কী শাস্তি পেতে চলেছে ম্যান সিটি? এত বড় দুর্নীতির জন্য পয়েন্ট কাটা যাবে তাদের, নাকি নির্বাসিত হতে পারে তারা, শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
প্রিমিয়ার লিগ (Premier League) জানিয়েছে, দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরে শাস্তি নির্ধারণের জন্য আলাদা শুনানি হবে। ফলে এখনই সিটির (Manchester City) বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনও শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে বড় অঙ্কের পয়েন্ট কাটা থেকে শুরু করে আরও কঠোর শাস্তি নিয়েও আলোচনা চলছে।
এই মামলার সূত্রপাত অবশ্য আরও আগে। ২০১৮ সালে ফাঁস হওয়া ক্লাবের ই-মেল ও নথি থেকে অভিযোগ সামনে আসে। পরে দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৩ সালে প্রিমিয়ার লিগ (Premier League) সরকারি ভাবে সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। প্রায় তিন বছরের আইনি প্রক্রিয়ার পর এ বার এল স্বাধীন কমিশনের রায়।
তবে রায়ের পরও লড়াই শেষ হচ্ছে না। আপিল করবে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City)। ফলে ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দুর্নীতি বিতর্কে এখন নজর পরবর্তী শুনানি এবং সম্ভাব্য শাস্তির দিকে।
দেখুন:




