প্রায় ১৭ মাস ধরে পাকিস্তানের আকাশে ঢুকতে পারছে না ভারতীয় বিমান। ঘোরাপথের খরচ আর সময়ের বোঝা বইতে হচ্ছে সংস্থা ও যাত্রী, দু’পক্ষকেই। এবার সেই বোঝা কমাতে চিনের দিকে তাকিয়ে নয়াদিল্লি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী কে রামমোহন নাইডু (Ram Mohan Naidu) জানিয়েছেন, শিনজিয়াং (Xinjiang) প্রদেশের হোটান (Hotan) অঞ্চলের আকাশপথ ব্যবহারের বিষয়ে বেজিংয়ের সঙ্গে কথা চলছে।
নাইডু ঠিক কী বললেন?
তিনি বলেছেন, বিকল্প পথ খুঁজছে ভারত। হোটান নিয়ে দুই দেশের আলোচনা চলছে। বিদেশমন্ত্রক (External Affairs Ministry) কথা বলছে চিনের সঙ্গে। তবে ফল কী হবে, এখনই বলা কঠিন। কোনও চুক্তির ঘোষণা হয়নি। সময়সীমাও জানানো হয়নি। সূত্রের খবর, আলোচনা চলছে বছরখানেকের বেশি সময় ধরে।
পাকিস্তানের আকাশ কেন বন্ধ?
২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলগাঁওয়ে (Pahalgam) জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়। এর পরেই টানাপড়েন চরমে ওঠে। ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করে ইসলামাবাদ। ৩০ এপ্রিল পাল্টা পদক্ষেপ করে ভারতও। তারপর থেকে প্রতি মাসে নতুন নোটাম (NOTAM) জারি করে নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে চলেছে পাকিস্তান। সর্বশেষ নোটামে মেয়াদ ২৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত। নিষেধাজ্ঞার আওতায় ভারতে নিবন্ধিত বিমান, ভারতীয় সংস্থার মালিকানাধীন বা ভাড়া করা বিমান এবং সেনা বিমানও।
ঘুরপথে বাড়তি খরচ?
উত্তর ও পশ্চিম ভারত থেকে ওড়া বিমানকে এখন ঘুরে যেতে হচ্ছে আরব সাগর (Arabian Sea) হয়ে ওমানের দিকে। প্রতিটি উড়ানে ৪৫ মিনিট থেকে প্রায় দু’ঘণ্টা বেশি লাগছে। বাড়ছে জ্বালানি খরচ। অথচ বিদেশি সংস্থা পাকিস্তানের উপর দিয়ে উড়তে পারে। ফলে তাদের যাত্রাপথ ছোট, ভাড়াও প্রতিযোগিতামূলক।
সবচেয়ে বেশি চাপে এয়ার ইন্ডিয়া (Air India)। রয়টার্সের হাতে আসা এক নথি অনুযায়ী, সংস্থা নিজেই সরকারকে চিনের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেছিল। তাদের হিসাবে হোটান হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা হলে সপ্তাহে প্রায় ১১ লক্ষ ৩০ হাজার ডলার (USD) বা ভারতীয় হিসেবে ১০ কোটি ৮৪ লক্ষ টাকা ক্ষতি কমতে পারে। এই বাড়তি খরচের কারণেই নিউ ইয়র্ক ও ভ্যাঙ্কুভার থেকে দিল্লির উড়ান কমাতে হয়েছে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। দিল্লি-ওয়াশিংটন উড়ান বন্ধই হয়ে গিয়েছিল।
হোটানের পথ আসলে কেমন?
প্রস্তাবিত পথে উত্তর ভারত থেকে বিমান লেহ (Leh) হয়ে ঢুকবে চিনের আকাশে। হোটানের উপর দিয়ে পশ্চিমে বেঁকে মধ্য এশিয়া (Central Asia) পেরিয়ে যুক্ত হবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার নির্ধারিত পথে। এতে সময় ও জ্বালানি, দুই-ই বাঁচার কথা।
তবে পথটা সহজ নয়। কারণ, এলাকাটি বিশ্বের অন্যতম উঁচু পর্বতশ্রেণির উপরে। চিনের আকাশে সেনার নিয়ন্ত্রণও অনেক বেশি। এয়ার ইন্ডিয়া হোটান, কাশগর ও উরুমকি-তে জরুরি অবতরণের সুযোগও চেয়েছিল। আর লেহ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে চিনের ভূখণ্ডে ঢোকার এই পথ কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর। তাই এটা শুধু বিমান চলাচলের প্রশ্ন নয়। কূটনীতি ও নিরাপত্তার বিষয়ও বটে।
চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নরম হচ্ছে?
কিছু ইঙ্গিত মিলছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইন্ডিগো (IndiGo) কলকাতা থেকে গুয়াংজু (Guangzhou) সরাসরি উড়ান চালু করে। নভেম্বরে শুরু হয় দিল্লি-গুয়াংজু। এ বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ছ’বছর পর দিল্লি-সাংহাই উড়ান চালু করে এয়ার ইন্ডিয়া। কয়েক দিন আগে দিল্লিতে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনে এসেছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। তার আগে গুয়াংজু-দিল্লি সরাসরি উড়ান ফের ঘোষণা করেছে চায়না সাউদার্ন। এই আবহেই নতুন করে উঠল আকাশপথের প্রস্তাব।
ইরানের আকাশেও কি ভরসা নেই?
না। নেই। ইরানের আকাশসীমাতেও কড়া বিধিনিষেধ, মাঝেমধ্যে তা পুরোপুরি বন্ধও থাকে। ভারতীয় সংস্থাগুলি ওই পথ এড়িয়েই চলছে। পূর্বে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান। দু’দিক থেকে চাপ বাড়ায় চিনের আকাশই এখন ভারতের কাছে বড় বিকল্প।
কলকাতা ও বাংলার যাত্রীদের কী লাভ?
কলকাতা-সহ জয়পুর, অমৃতসর, চণ্ডীগড়, দিল্লি ও লখনউয়ের উড়ান এখন আরব সাগর হয়ে ওমানের আকাশ ঘুরে যাচ্ছে। ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকাগামী বাঙালি যাত্রীর টিকিটের দাম ও সময়, দুই-ই এর সঙ্গে জড়িত। পথ খুললে ভাড়া কমার আশা আছে। তবে নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে কলকাতা-গুয়াংজু উড়ান আগে থেকেই চালু। চিনের সঙ্গে আকাশযোগে বাংলার সংযোগ তাই নতুন নয়।
এর পর কী?
২৪ অক্টোবর শেষ হচ্ছে পাকিস্তানের বর্তমান নোটামের মেয়াদ। এতদিন প্রতিবারই তা বাড়ানো হয়েছে। নজর থাকবে পরের নোটামের দিকে। আর নজর থাকবে বেজিংয়ের সবুজ সংকেতের দিকেও।




