ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক বুধবার। তার ঠিক আগেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিল কংগ্রেস। এদিন ওয়ার্কিং কমিটির (Congress Working Committee বা CWC) বৈঠকে দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে অবিলম্বে সরানোর দাবি তুলেছেন। সঙ্গে রেখেছেন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে পাঁচ দফা দাবি। খাড়গের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার কেন্দ্রের হাতের পুতুল। কমিশন স্বভাবতই এই অভিযোগ মানতে নারাজ।
পাঁচ দাবি কী?
প্রথম দাবি, ভোটার তালিকায় কাদের নাম নতুন যুক্ত হল, কাদের বাদ হল… এই সব বদলের তথ্য প্রকাশ্যে আনতে হবে। দ্বিতীয়, যাঁর নাম বাদ যাবে, তাঁকে জানাতে হবে এবং আপিলের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়, সব রাজনৈতিক দলকে সহজ ফরম্যাটে ও ঠিক সময়ে ভোটার তালিকা দিতে হবে। চতুর্থ, বড় অসঙ্গতি ধরা পড়লে স্বাধীন-নিরপেক্ষ তো বটেই, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত চাই। পঞ্চম, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এমন স্বচ্ছ হোক, যাতে কেউ তথ্য চেপে রাখার অভিযোগই তুলতে না পারে।
খাড়গে জানিয়েছেন, ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে লড়াই চলবে রাস্তা থেকে সংসদ পর্যন্ত। আগামী বছর পাঁচ রাজ্যে ভোট, তাই কোনও যোগ্য ভোটারের অধিকার যেন না কাড়া হয়, সেটাই তাঁদের লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য।
কেন টার্গেট জ্ঞানেশ কুমার?
২৩ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক রিপোর্টে দাবি করা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী নানা বিষয়ে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। বিষয় ছিল বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR), নতুন ভোটারের ফর্ম ৬ (Form 6) এবং ভোটার তালিকার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সেই আপত্তিকে পাত্তাই দেননি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
যদিও বিতর্ক জমাটা বাঁধার পর গত ২৬ সেপ্টেম্বর তিন কমিশনার একসঙ্গে প্রেস নোট দেন। কমিশনের বক্তব্য, এসআইআর-এর সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত। মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু কোনও ফাটল নেই। এর পর থেকে কমিশনের বৈঠকের এজেন্ডা আগাম দেওয়া হবে, কার্যবিবরণীও প্রকাশ হবে। তবে বিরোধীদের যুক্তি, দুই কমিশনারের আপত্তির ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই পরে সংশোধনের ঘোষণা করা হয়েছে। এর মানে রিপোর্টের সারকথা পক্ষান্তের মেনে নেওয়া।
কংগ্রেসের ছকটা কী?
দাবির তালিকাটা লক্ষ করলে একটা হিসেব বোঝা যায়। প্রায় সবই স্বচ্ছতা আর ভোটারের অধিকারের কথা। এতে কোনও শরিকের আপত্তির জায়গা কম।
আসল লক্ষ্য জোটকে এক ছাতার নীচে আনা। সমস্যা একটাই। তৃণমূল ও আরজেডি চায়, এসআইআর-এর পর যেসব রাজ্যে ভোট হয়ে গিয়েছে, সেখানকার নির্বাচনই বাতিল হোক। কংগ্রেস এই দাবিতে সহজে একমত হতে পারবে না। কারণ এ বছর কেরলমে তারা জিতেছে, তামিলনাড়ুতেও তারা সরকারের শরিক। তাই দল চাইছে, প্রস্তাবে পুরো এসআইআর বাতিলের দাবি থাকুক, কিন্তু নতুন ভোটের দাবি নয়।
পাশাপাশি, আইনি পথও খোলা রাখা হয়েছে। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ (Article 324(5)) অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সরাতে হয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের মাধ্যমে। গত এপ্রিলেই ৭৩ জন বিরোধী সাংসদ রাজ্যসভায় এই মর্মে নোটিস দিয়েছিলেন। খাড়গের দাবি, বর্ষাকালীন অধিবেশন যখন এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়নি বা প্রোরোগ হয়নি, তখন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই নোটিসে সিদ্ধান্ত নিন।
বুধেই আসল পরীক্ষা
৮ জুনের পর এই প্রথম জোটের শীর্ষ নেতারা একসঙ্গে বসছেন। সূত্র বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের থাকার কথা। অখিলেশ যাদব প্রতিনিধি পাঠাতে পারেন বলে খবর। দিল্লিতে মিলমিশ থাকলেও স্তানীয় রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলায় কংগ্রেস ও সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘাতও জোটের অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। কংগ্রেসের পাঁচ দাবি শেষ পর্যন্ত জোটের যৌথ প্রস্তাব হয়ে উঠতে পারে কি না, সেটাই দেখার।
বাংলার কাছে কেন বড় খবর?
এসআইআর-এ বাংলায় বাদ পড়া ভোটারদের আপিল ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে প্রায় ৩৮ লক্ষ। ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র সওয়া লক্ষের মতো। ৬ অক্টোবর রেজিনগর ও নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন। সুপ্রিম কোর্ট শুনানি এগিয়ে আনতে চায়নি, নতুন শুনানির তারিখ ঠিক হয়েছে ৫ অক্টোবর। কংগ্রেসের দ্বিতীয় দাবি, অর্থাৎ বাদ পড়াদের আপিলের সুযোগ, তাই বাংলার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।




