• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 27 September, 2026

একাধিক কৃষি-সহায়তা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, কৃষকের স্বস্তি

অন্নপূর্ণা প্রকল্পের বকেয়া অর্থ দ্রুত দেওয়ার ঘোষণাও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ভেরিফিকেশন শেষ হওয়া যোগ্য আবেদনকারীদের টাকা পুজোর আগে দেওয়া গেলে বহু পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু এখানেও স্বচ্ছ তালিকা, আবেদন বাতিলের কারণ জানানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

একাধিক কৃষি-সহায়তা ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, কৃষকের স্বস্তি

CM Suvendu Adhikari Photo-SNS

পূর্ব বর্ধমানকে পশ্চিমবঙ্গের ‘শস্যভাণ্ডার’ বলা হয়। এই জেলার বিস্তীর্ণ মাঠে ধান, আলু-সহ নানা ফসলের চাষ হয়। তাই কৃষকের
উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা শুধু কৃষকের স্বার্থের বিষয় নয়, রাজ্যের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব বর্ধমানের প্রশাসনিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষিত একাধিক কৃষি-সহায়তা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বের দাবি রাখে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘোষণা কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের উপর প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ভর্তুকি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে চার লক্ষের বেশি কৃষক উপকৃত হতে পারেন এবং সেচের বিদ্যুৎ খরচে বছরে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। কৃষির ক্ষেত্রে সেচ একটি বড় ব্যয়। বিশেষ করে ডিজেল, বিদ্যুৎ, সার, বীজ, শ্রমিক ও কীটনাশকের দাম বাড়ার সময় বিদ্যুৎ-ভর্তুকি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে বাস্তব ভূমিকা নিতে পারে। তবে এই সুবিধা কতজন কৃষক বাস্তবে পাবেন এবং ঘোষিত সাশ্রয় কতটা তাঁদের হাতে পৌঁছবে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রকাশ করাও জরুরি।

ধানের দাম নিয়ে ঘোষণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার কথা বলেছে এবং কুইন্টাল-পিছু ২৭০০ টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমিয়ে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু দাম ঘোষণা করলেই হবে না। ধান কেনার কেন্দ্র যথেষ্ট সংখ্যায় চালু করা, সময়মতো ওজন, স্বচ্ছ নথিভুক্তি এবং দ্রুত কৃষকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছনো—এই প্রতিটি ধাপ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পিএম-কিষান প্রকল্পের অধীনে কেন্দ্রের ৬ হাজার টাকার সঙ্গে রাজ্যের আরও ৩ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণাও কৃষকের হাতে সরাসরি নগদ সহায়তা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত্রে এই অর্থ বীজ, সার বা সেচের খরচ মেটাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন এবং জমির পরিমাণ অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও নজরকাড়া।

তবে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি শুধু ভর্তুকির উপর নির্ভর করতে পারে না। উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি ফসলের ন্যায্য বাজারদর, সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষিঋণ, ফসলবিমা, উন্নত বীজ, সেচের নিশ্চয়তা এবং গ্রামীণ পরিকাঠামো— সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হবে। আলুচাষিদের জন্য ডিসেম্বর মাসে বিশেষ প্যাকেজের ঘোষণাও তাই দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়া দরকার। আলু উৎপাদনে দাম পড়ে যাওয়া বা সংরক্ষণে সমস্যা হলে কৃষকের লাভ মুহূর্তে ক্ষতিতে পরিণত হতে পারে।

অন্নপূর্ণা প্রকল্পের বকেয়া অর্থ দ্রুত দেওয়ার ঘোষণাও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ভেরিফিকেশন শেষ হওয়া যোগ্য আবেদনকারীদের টাকা পুজোর আগে দেওয়া গেলে বহু পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু এখানেও স্বচ্ছ তালিকা, আবেদন বাতিলের কারণ জানানো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

বর্ধমানের কৃষকরা ঘোষণায় স্বস্তির আশা করতেই পারেন। কিন্তু সরকারের ঘোষণার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মাঠে তার বাস্তব প্রয়োগের উপর। ভর্তুকি যদি সময়মতো পৌঁছয়, ধান যদি ঘোষিত দামে সরাসরি বিক্রি করা যায় এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ সত্যিই কমে, তবেই এই উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে। ‘শস্যভাণ্ডার’ বর্ধমানের কৃষককে শক্তিশালী করা মানে রাজ্যের খাদ্যভিত্তিক অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করা। তাই এখন মূল প্রশ্ন ঘোষণা নয়— কত দ্রুত, কত স্বচ্ছভাবে এবং কতজন কৃষকের কাছে সেই ঘোষণার সুবিধা পৌঁছয়।