• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 25 September, 2026

ট্রাম্প-শি বৈঠক : লাল কার্পেটের নিচে রয়েছে কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমেরিকা-চিন সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি, বরং তার চরিত্র কিছুটা বদলেছে। প্রকাশ্য সংঘাতের

ট্রাম্প-শি বৈঠক : লাল কার্পেটের নিচে রয়েছে কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমেরিকা-চিন সম্পর্কের টানাপোড়েন কমেনি, বরং তার চরিত্র কিছুটা বদলেছে। প্রকাশ্য সংঘাতের বদলে এখন দেখা যাচ্ছে দর-কষাকষি, সাময়িক সমঝোতা এবং কৌশলগত বিরতির এক জটিল খেলা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অভূতপূর্ব উষ্ণতায় স্বাগত জানালেন, তখন সেই দৃশ্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। বিমানবন্দরে ব্যক্তিগত অভ্যর্থনা, লাল কার্পেট, রাষ্ট্রীয় ভোজ— সব মিলিয়ে মনে হতে পারে, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলছে। কিন্তু এই আড়ম্বরের নীচে বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন।
শি জিনপিংয়ের আমেরিকা সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট— চিনের উত্থানের পথে আমেরিকার চাপ কমানো। বিশেষ করে বাণিজ্য, উন্নত প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, বিরল খনিজ এবং তাইওয়ান প্রশ্নে বেজিং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু এবারের বৈঠকে সেই নিশ্চয়তা পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।
দুই দেশ শুল্কযুদ্ধ আরও বাড়িয়ে না তোলার জন্য যে সাময়িক বাণিজ্য-সমঝোতায় পৌঁছেছিল, তার মেয়াদ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। চিন আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য এই বিরতি চেয়েছিল। ফলে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখনই দীর্ঘমেয়াদি ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। বরং চিনকে তার প্রতিশ্রুতিগুলি আরও কার্যকরভাবে পালন করতে হবে— এমন একটি অবস্থানই যেন আলোচনার ভিতরে
কাজ করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরল খনিজের প্রশ্ন। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নানা ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে ব্যবহৃত বিরল খনিজের সরবরাহে চিনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা উন্নত চিপ ও প্রযুক্তি চিনের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে দু’দেশের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে বাণিজ্য শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত শক্তিরও অংশ।
চিনের জন্য এই পরিস্থিতি সহজ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনা পণ্যের বিক্রি বাড়লেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চাহিদা দুর্বল। তরুণদের বেকারত্ব একটি সমস্যা হয়ে রয়েছে, আবাসন বাজারেও দীর্ঘদিনের মন্দার প্রভাব রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রপ্তানি চিনের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। তাই আমেরিকার বাজারে চিনা পণ্যের প্রবেশে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বেজিংয়ের পক্ষে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণেই ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখা শি-র কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে রয়েছে তাইওয়ান। চিন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। অন্যদিকে আমেরিকার আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করা হয়। ফলে তাইওয়ান আমেরিকা-চিন সম্পর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতের ক্ষেত্রগুলির একটি। শি জিনপিং স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি চিনের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এমনকি তিনি সতর্ক করেছেন, ভুলভাবে এই সমস্যা পরিচালিত হলে দুই দেশ সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত বিপুল অঙ্কের অস্ত্রচুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প একসময় এই অস্ত্রচুক্তিকে বেজিংয়ের সঙ্গে দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার অভ্যন্তরেও তাইওয়ানকে সমর্থন অব্যাহত রাখার পক্ষে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। ফলে তাইওয়ান প্রশ্নে কোনও সহজ সমাধান আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
দুই নেতার আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ও উঠে এসেছে। ভবিষ্যতের অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এআই যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। শি বলেছেন, এআই যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। কিন্তু এই বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনও বড় ও স্পষ্ট সমঝোতা হয়েছে বলে এখনও জানা যায়নি। অর্থাৎ সহযোগিতার সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাও বজায় রয়েছে।
এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এশিয়ার ভবিষ্যৎ। চিনের কিছু কৌশলবিদ মনে করেন, এশিয়ার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমেরিকার প্রভাব ধীরে ধীরে কমানো দরকার। তাঁদের বক্তব্য, এশিয়ার সমস্যা এশিয়ার দেশগুলিই নিজেদের মধ্যে সমাধান করবে। এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে এশিয়ার বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামো অনেকটাই বদলে যেতে পারে। আমেরিকার মিত্র ও অংশীদার দেশগুলির কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশের জন্য, কারণ ভারত একদিকে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে তার নিজস্ব সীমান্ত ও আঞ্চলিক স্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে।
চিন-আমেরিকার বর্তমান সমঝোতাকে তাই স্থায়ী শান্তি বলা কঠিন। বরং এটি দুই শক্তির মধ্যে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’— যেখানে উভয় পক্ষই সময় নিচ্ছে, নিজেদের দুর্বলতা কমাচ্ছে এবং ভবিষ্যতের দর-কষাকষির জন্য শক্তি সঞ্চয় করছে।
এই অবস্থায় ট্রাম্পের উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং
শি-কে দেওয়া রাষ্ট্রীয় সম্মানের রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই আছে। চিনের অভ্যন্তরেও এই দৃশ্য শি জিনপিংয়ের মর্যাদা বাড়াতে পারে। কিন্তু কূটনীতিতে দৃশ্যমান উষ্ণতা আর বাস্তব সমঝোতা এক জিনিস নয়।
পান্ডা উপহার, রাষ্ট্রীয় ভোজ, বন্ধুত্বের উষ্ণ শব্দ— এসব দুই দেশের সম্পর্ককে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে। কিন্তু শুল্ক, চিপ, বিরল খনিজ, এআই, তাইওয়ান এবং এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে মৌলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই যাচ্ছে।
অতএব, ট্রাম্প-শি জিনপিংয়ের বৈঠককে শুধু বন্ধুত্বের প্রদর্শন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে সহযোগিতা, প্রতিযোগিতা এবং শক্তির ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দর-কষাকষির একটি পর্ব। লাল কার্পেটের নিচে সেই কঠিন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাই এখনও অটুট।