• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 22 September, 2026

Explainer: আচমকাই নেমে আসছে অন্ধত্ব, ওজেম্পিক-সহ একাধিক ওজন কমানোর ম্যাজিক ওষুধে নতুন আতঙ্ক

গবেষকদের নজরে একটা অসুখ বারবার উঠে আসছে তার নাম নন-আর্টেরাইটিক অ্যান্টেরিয়র ইশকেমিক অপটিক নিউরোপ্যাথি, সংক্ষেপে NAION। একে বলা হয় চোখের স্ট্রোক।

Explainer: আচমকাই নেমে আসছে অন্ধত্ব, ওজেম্পিক-সহ একাধিক ওজন কমানোর ম্যাজিক ওষুধে নতুন আতঙ্ক

Magic weight loss medicines like Ozempic is causing sudden blindness (@Pexels/Polina Tankilevitch)

ওজন কমানোর জাদু-ওষুধ বলে পরিচিত ওজেম্পিক আর উইগোভির (Ozempic, Wegovy) কদর এখন তুঙ্গে। ডায়াবেটিস সামলানো থেকে শুরু করে কয়েক মাসে কেজি কেজি ওজন ঝরানো, সেমাগ্লুটাইড (semaglutide) নামের এই যৌগ রাতারাতি বদলে দিয়েছে ওবিসিটি ম্যানেডমেন্টের ছবিটা। কিন্তু গত দুই-তিন বছর ধরে চিকিৎসাক্ষেত্রের একের পর এক গবেষণা বারবার একটা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, এই ওষুধগুলো কি চোখের দৃষ্টি কেড়ে নিতে পারে? প্রশ্নের উত্তরটা আদৌ সহজ নয়। বরং যে কথাটা সামনে আসছে, তা আতঙ্কের।

বিরল রোগ

গবেষকদের নজরে একটা অসুখ বারবার উঠে আসছে তার নাম নন-আর্টেরাইটিক অ্যান্টেরিয়র ইশকেমিক অপটিক নিউরোপ্যাথি, সংক্ষেপে NAION। একে বলা হয় চোখের স্ট্রোক (eye stroke)। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেমন স্ট্রোক হয়, তেমনই অপটিক নার্ভে রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে এই রোগ দেখা দেয়। আচমকাই এই ঘটনা ঘটতে পারে। রোগী বুঝতেও পারেন না। কারণ, এটা ব্যথাহীন। স্ট্রোকের জেরে একদিকের চোখে হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, কয়েক দিনের মধ্যে তা আরও খারাপ হতে থাকে। মুশকিল হল, এই ক্ষতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থায়ী। এখনও পর্যন্ত এমন কোনও চিকিৎসা নেই যা এই অন্ধত্ব পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে পারে।

গবেষণা কী বলছে

২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ম্যাসাচুসেটস আই অ্যান্ড ইয়ারের চিকিৎসকরা প্রথম খেয়াল করেন, সেমাগ্লুটাইড নেওয়া কয়েকজন রোগীর মধ্যে NAION-এর ঘটনা যেন একটু বেশিই। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই শুরু হয় বড় মাপের গবেষণার। ২০২৪ সালে জামা অপথ্যালমোলজি (JAMA Ophthalmology) জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগী, যাঁরা সেমাগ্লুটাইড নিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে NAION হওয়ার আশঙ্কা প্রায় চার গুণ বেশি। আর যাঁরা কেবলমাত্র ওজন কমানোর জন্য ওষুধ নিচ্ছেন, তাঁদের ঝুঁকি সাত গুণেরও বেশি।

তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত আরও একটি অনেক বড় মাপের সমীক্ষা, যেখানে গোটা বিশ্বের ১৪টি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার থেকে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষের তথ্য খতিয়ে দেখা হয়, তাতে দেখা যায় সেমাগ্লুটাইড শুরু করার পর NAION-এর ঝুঁকি সামান্য বাড়লেও তুলনামূলক অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে ফারাকটা অনেক ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যানগতভাবে তেমন জোরালো নয়। প্রাক্তন সেনাকর্মীদের নিয়ে করা একটি মার্কিন সমীক্ষায় আবার অন্য একটি ডায়াবেটিসের ওষুধ SGLT2-এর তুলনায় ঝুঁকি দ্বিগুণ বলে উঠে এসেছে।

আমেরিকা কেন এখনও চুপ

এই বিতর্কের মধ্যেই ২০২৫ সালের জুন মাসে বড় পদক্ষেপ করে ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (EMA)। তাদের সেফটি কমিটি সরকারিভাবে জানিয়ে দেয়, NAION সেমাগ্লুটাইডের একটি অতি বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। যার মানে হল, প্রতি দশ হাজার ব্যবহারকারীর মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) চিকিৎসক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে সতর্ক করেছে একই মাসে।

তবে আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) এখনও ওজেম্পিকের প্যাকেজিংয়ে NAION নিয়ে কোনও সরাসরি সতর্কবার্তা যোগ করেনি। এফডিএ-র নিজের তথ্যভাণ্ডারেই অবশ্য ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওজেম্পিক ও উইগোভি সংক্রান্ত প্রায় ৩৮৩৯টি দৃষ্টিসমস্যার অভিযোগ জমা পড়েছে।

শুধু NAION নয়, চোখের আরও কিছু সমস্যা

গবেষকরা শুধু NAION নিয়েই থেমে নেই। ২০২৫ সালের একাধিক সমীক্ষায় GLP-1 ধরনের ওষুধের (GLP-1 receptor agonist) সঙ্গে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি এবং নিওভাসকুলার এজ-রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন বা nAMD-র সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথাও উঠে এসেছে। আবার উল্টো দিকে, কিছু গবেষণা বলছে এই একই ওষুধ শুষ্ক ধরনের ম্যাকুলার ডিজেনারেশন থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। অর্থাৎ ছবিটা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, বরং জটিল এবং কিছুটা পরস্পরবিরোধী।

চিকিৎসকরা আরও একটা বিষয়ে সতর্ক করছেন। রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত কমে গেলে সাময়িকভাবে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে, তার সঙ্গে স্থায়ী NAION-এর কোনও সম্পর্ক নেই। দুটো আলাদা সমস্যা, গুলিয়ে ফেললে চলবে না।

তাহলে কি ওষুধ বন্ধ করবেন

বিশেষজ্ঞদের সাফ কথা, আতঙ্কিত হয়ে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করার দরকার নেই। ম্যাস আই অ্যান্ড ইয়ারের চিকিৎসক জোসেফ রিজ্জো নিজেই বলেছেন, তাঁর গবেষণার ফলাফল দেখে কোনও রোগীকে ওষুধ বন্ধ করতে বলার মতো প্রমাণ এখনও নেই। বরং তাঁর পরামর্শ, চিকিৎসক আর রোগীর মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হোক, বিশেষত যাঁদের চোখের আগে থেকেই কোনও সমস্যা আছে বা পরিবারে NAION-এর ইতিহাস আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ, ওষুধ শুরুর প্রথম এক বছর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে বলে নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করানো ভালো। কোনও একদিকে হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেলে বা চোখের সামনে কোনও স্পট ঘরোঘুরি করছে এমন অনুভূতি হলে অবিলম্বে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত, দেরি করলে ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। নেমে আসতে পারে অকাল অন্ধত্ব।

 

মূল কথা এক লাইনে: ওজেম্পিক বা উইগোভির মতো ওষুধ নিলেই অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় পাওয়ার কারণ নেই, কিন্তু NAION নামের বিরল এই ঝুঁকিটা এখন বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত। তাই সচেতনতাই এখানে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।