• facebook
  • twitter
  • youtube
Monday, 21 September, 2026

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন সমঝোতা

ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরে তাঁর বক্তব্যে এমন কঠোরতা দেখা দেয় যে, ইউরোপের অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কারণ প্রশ্নটি তখন শুধু গ্রিনল্যান্ডের ছিল না; প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছিল— একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কি অন্য একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করে বদলে দিতে পারে? এ বছর জানুয়ারিতে আমেরিকার সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বিরোধ প্রায় চরমে পৌঁছতে চলেছিল।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন সমঝোতা

File Photo

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে কয়েক মাসের তীব্র কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর আমেরিকা, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড একটি নতুন নিরাপত্তা-সমঝোতায় পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যাতে মনে হচ্ছে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমেরিকা দীর্ঘমেয়াদি ও প্রায় স্থায়ী কর্তৃত্ব পেল। অন্যদিকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বক্তব্য, এই চুক্তি তাদের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখবে। চুক্তির পূর্ণ পাঠ এখনও প্রকাশিত হয়নি। ফলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

তবু একটি বিষয় স্পষ্ট— গ্রিনল্যান্ড আর শুধু বরফে ঢাকা দূরবর্তী একটি দ্বীপ নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূ-রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। গ্রিনল্যান্ডের আয়তন প্রায় ২২ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৫৬ হাজার। কিন্তু এর ভৌগোলিক অবস্থান অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝখানে, আর্কটিক অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই দ্বীপ থেকে উত্তর আটলান্টিক, আর্কটিক সমুদ্রপথ এবং উত্তর গোলার্ধের সামরিক গতিবিধির ওপর নজর রাখা সম্ভব। ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং সামরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে। আমেরিকার পিটুফিক স্পেস বেস সেই কৌশলগত গুরুত্বেরই প্রমাণ।

শুধু সামরিক কারণ নয়, প্রাকৃতিক সম্পদও গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থসহ নানা খনিজের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে এখানে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও নানা উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে এই খনিজগুলির প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় ভবিষ্যতে নতুন সমুদ্রপথও খুলে যেতে পারে। ফলে আমেরিকা, রাশিয়া, চিন এবং ইউরোপ— সকলেরই আর্কটিক অঞ্চলে আগ্রহ বাড়ছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নও গ্রিনল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড-নীতি বুঝতে হবে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের ওপর আরও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। একসময় তিনি দ্বীপটি কিনে নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরে তাঁর বক্তব্যে এমন কঠোরতা দেখা দেয় যে, ইউরোপের অনেক দেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কারণ প্রশ্নটি তখন শুধু গ্রিনল্যান্ডের ছিল না; প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছিল— একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কি অন্য একটি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র চাপ সৃষ্টি করে বদলে দিতে পারে? এ বছর জানুয়ারিতে আমেরিকার সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বিরোধ প্রায় চরমে পৌঁছতে চলেছিল। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন বহু মানুষ। তাঁরা সরব হয়েছিলেন তাঁদের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার দাবিতে।

সেখানেই বর্তমান সমঝোতার গুরুত্ব। নতুন চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকার গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে। মার্কিন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে আমেরিকার স্থায়ী প্রবেশাধিকার, ঘাঁটি ব্যবহারের অধিকার এবং আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে ন্যাটোর বাইরের দেশগুলির সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এমন বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে, যা আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে— নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তার উপর নিয়ন্ত্রণ কি একই বিষয়? ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড বলছে, সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ থাকবে। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকার করেই সমঝোতা হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্থায়ীভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। এই দুই বক্তব্যের মধ্যে বাস্তব পার্থক্য কোথায়, তা বোঝার জন্য চুক্তির সম্পূর্ণ ভাষা প্রকাশ পাওয়া জরুরি।

কারণ ১৯৫১ সাল থেকেই গ্রিনল্যান্ডে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির আইনগত ভিত্তি রয়েছে। অর্থাৎ নতুন সমঝোতা সম্পূর্ণ শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। প্রশ্ন, পুরনো ব্যবস্থার তুলনায় নতুন চুক্তি আমেরিকাকে কতটা বাড়তি ক্ষমতা দিচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। কিন্তু ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চাওয়া আর আমেরিকার অধীনে চলে যাওয়া— এই দুটি এক বিষয় নয়। গ্রিনল্যান্ডের অনেক মানুষই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চান। তাই আমেরিকা-ডেনমার্কের সমঝোতার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য।

এই জায়গাতেই ন্যাটোর ভবিষ্যতের প্রশ্নটি এসে পড়ে। ন্যাটো আপাতত এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, এটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু গত কয়েক মাসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা ন্যাটোর অভ্যন্তরে আস্থার প্রশ্নও সামনে এনেছে। ট্রাম্পের চাপের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলি নিজেদের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টিও নতুন করে ভাবছে। তাই এই সমঝোতাকে শুধু একটি কূটনৈতিক বিরোধের আপাত সমাপ্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে আর্কটিকের ভবিষ্যৎ, আমেরিকা-ইউরোপ সম্পর্ক, ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণ— সবকটি প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তার পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ পেলে আসল চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত বলা যায়, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার ভূখণ্ডে পরিণত করার দাবি থেকে সরে এসে নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে নিজের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়েছেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডও আলোচনার মাধ্যমে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি সামনে রেখেছে। ফলে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা— নতুন ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয় এবং সেই ব্যবস্থার মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণ কতটা সুরক্ষিত থাকে।

গ্রিনল্যান্ডের বরফের নিচে যেমন বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা, তেমনই তার চারপাশের বরফ গলতে গলতে খুলে দিচ্ছে নতুন ভূ-রাজনৈতিক পথ। আগামী দিনে এই সাদা ভূখণ্ড সম্ভবত বিশ্ব রাজনীতির আরও বড় মঞ্চ হয়ে উঠবে।