রবিবার রাতে ঘোষণা, সোমবার থেকে কার্যকর। জ্বালানির জ্বালায় ওষ্ঠাগত বাংলাদেশ। ডিজেল (Diesel), পেট্রল (Petrol), অকটেন (Octane) আর কেরোসিন (Kerosene), চার জ্বালানির দামই এক ধাক্কায় বাড়ল লিটারপিছু ২০ বাংলাদেশি টাকা। এত চড়া খুচরো দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশে আগে কখনও দেখা যায়নি।
সংকট অবশ্য শুধু পেট্রল পাম্পেই আটকে নেই। রয়টার্সের (Reuters) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার এক বাসিন্দাকে রান্নার জন্য গ্যাস আসার অপেক্ষায় কখনও কখনও মাঝরাত পর্যন্ত বসে থাকতে হচ্ছে। বেড়েছে লোডশেডিং। দাবি, কোনও কোনও এলাকা ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকার ঘটনা ঘটছে রাজধানী ঢাকাতেই। লোডশেডিংয়ে (Load Shedding) থমকে যাচ্ছে কারখানাও। একদিকে জ্বালানির আগুন দাম, অন্য দিকে বিদ্যুতের টান, তার উপর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে হাত দিলেও ছ্যাঁরা লাগছে। পালাবদলের পর এক ভয়ংঙ্কর অর্থনৈতিক সংকটের (Economic Crisis) জাঁতাকলে এখন বাংলাদেশ। কিন্তু, কেন এমন হল?
এক রাতে বাড়ল দাম
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি (Fuel Price Hike) নিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা, বৃদ্ধি ১৭.৪ শতাংশ। পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, বৃদ্ধি ১৪.৩ শতাংশ। অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা, বৃদ্ধি ১৩.৮ শতাংশ। কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, বৃদ্ধি ১৪.৮ শতাংশ।
ইরানে মার্কিন-ইজরায়েলি যৌথহামলার আগে, ফেব্রুয়ারিতে ডিজেল ছিল লিটারপিছু ১০০ টাকা। সেই হিসেবে দাম এখন ৩৫ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারের আমলে এটি দ্বিতীয় বড় বৃদ্ধি। এপ্রিলে ডিজেল বেড়েছিল ১৫ টাকা, অকটেন ২০ টাকা। ডেইলি স্টারের (The Daily Star) হিসেবে, ২০২২ সালের আগস্টের পর এটিই সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
হঠাৎ এত লাফ কেন?
প্রথম কারণ, বিশ্ববাজার। জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বেড়েছে জাহাজভাড়াও।
দ্বিতীয় কারণ, লোকসান। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (BPC) লোকসান মার্চ থেকে আগস্ট, এই ছয় মাসে প্রায় ২২,৮৭৬ কোটি টাকা। দেশে দাম না বাড়ানো আর চড়া দামে তেল কেনা, এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে লোকসান লাফিয়ে বেড়েছে বিপিসি-র।
তৃতীয় কারণ, ভর্তুকি (Subsidy)। প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ ইসলাম অমিত (Aninda Islam Amit) জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারের দর ধরলে ডিজেলের দাম আসলে রাখতে হত লিটারে ২০৫ টাকা। অর্থাৎ, ২০ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে লিটারপিছু ৭০ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। চাঁর বক্তব্য, আগের মতো ভর্তুকি চালালে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প টানা কঠিন হত। এর পাশাপাশিই ছিল পাচারের আশঙ্কা। প্রতিবেশী দেশে দাম বেশি হওয়ায় সীমান্ত পেরিয়ে তেল চলে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও বলেছে জ্বালানি বিভাগ।
আলো নিভছে কেন?
বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) থেকে। রয়টার্স জানিয়েছে, এক সময় এই আমদানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আসত কাতার থেকে। সেই জোগানেই এখন টান।
কারণ, ইরানে হামলার পর হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে তেল-গ্যাসের রপ্তানি ব্যাহত। এবার সৌদি আরব ও ইরানপন্থী হুতিদের লড়াইয়ে বিপদে পড়েছে লোহিত সাগর (Red Sea) দিয়ে বাণিজ্যও। এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম যুদ্ধের আগে ছিল প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (MMBtu) ১০ ডলারের (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৫৬ টাকা) কাছাকাছি। এ সপ্তাহে তা ৩০ ডলারের (প্রায় ২,৮৬৭ টাকা) কাছে পৌঁছেছে। শেলের (Shell) হিসেবে, চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ টন এলএনজি নষ্ট হয়েছে।
এর মধ্যেই ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি (Excelerate Energy) পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটে। পাইপলাইনে গ্যাসের জোগান কমে যায় ১৭ শতাংশেরও বেশি। ঢাকা ট্রিবিউন (Dhaka Tribune) জানাচ্ছে, ১১ আগস্ট বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৮,৯৭৫ মেগাওয়াট (MW)। সেখানে জোগান গিয়েছে মাত্র ১৫,৮৩৩ মেগাওয়াট। লোডশেডিং একসময় ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট ছুঁয়ে ২০২৩ সালের জুনের আগের রেকর্ড (৩,৪১৯ মেগাওয়াট) ভেঙে দিয়েছে। সাধারণত রাজধানী ঢাকা গোটা দেশের সাপেক্ষে এই ধাক্কা থেকে খানিক আড়ালে থাকে। এবার আর তা হয়নি।
আশ্চর্যের বিষয় হল, দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার অভাব নেই। অভাব আসলে জ্বালানির। গ্যাস, এলএনজি আর কয়লার অভাবে বহু কেন্দ্র বসে রয়েছে। কোনও কাজই নেই।
ডলার ফুরিয়েছে?
অনেকেই ভাবছেন, বাংলাদেশে ফরেন রিজার্ভ বা পক্ষান্তরে ডলারের সংকটই এই দুরবস্থার আসল কারণ। যদিও তথ্য অন্য কথা বলছে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার (Forex Reserves) বেড়ে হয়েছে ৩৭.৫৭ বিলিয়ন ডলার। লেনদেনের ভারসাম্যেও (Balance of Payments) উদ্বৃত্ত দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৬ বিলিয়ন ডলার।
তা হলে চাপটা কোথায়? সহজ উত্তর, ভর্তুকিতে। এমনি সময়ে যেখানে বছরে ৬,০০০ কোটি টাকারও কম লাগে, গত অর্থবছরে সরকারকে সেখানেই দিতে হয়েছে ১৪,৫০০ কোটি টাকা। এ বছর শুধু এলএনজির জন্যই ভর্তুকি-বাবদ ৪০,০০০ কোটি টাকা (প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ডলার) লাগতে পারে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই যে সংকটের সময়েও বাংলাদেশে ফরেন রিজার্ভ বাড়ল, এর পিছনে আসলে বড় ভূমিকা আছে প্রবাসী আয়ের (Remittance)। তবে যা পরিস্থিতি তাতে এই গতি ধরে রাখা কঠিন হবে বলেই আশঙ্কা।
বাজারে কী ঘটছে?
সোমবার থেকেই বাজারের গরমে নাস্তানাবুদ আমজনতা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (The Business Standard) প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাসের ভাড়া ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। খুলনা, বরিশাল, মাদারীপুরগামী বাসে বাড়তি ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত। চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসে তা ১০০ টাকা পর্যন্ত। এপ্রিলে কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা ভাড়া বাড়িয়েছিল সরকার। তখনই বলা হয়েছিল, জ্বালানির দাম বদলালে সূত্র ধরে ভাড়া সমন্বয় করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (BRTA)।
জ্বালানির জাম বাড়ায় চাষের খরচেও চাপ বাড়বে। কৃষি গবেষকদের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বোরো ধানের মোট খরচের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই যায় সেচে (Irrigation)। জলের পাম্প চালাতে হলে তেল লাগবে। ফলে বাড়তি খরচ।
কলকারখানার হাল আরও কঠিন। বস্ত্রশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BKMEA) সমীক্ষার কথা লিখেছে রয়টার্স। আগস্টের শেষ থেকে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার ক্রেতা অর্ডার বাতিল বা কমিয়েছেন। ৭৮ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন আংশিক বন্ধ। রপ্তানি করে দেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি অর্থের জোগান দেওয়া পোশাক শিল্পের (Garment Industry) জন্য এটা বড় ধাক্কা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (Iqbal Hasan Mahmud) নিজেও মেনেছেন, শিল্পের বৃদ্ধি কমছে।
মূল্যস্ফীতি (Inflation) এমনিতেই চড়া। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (BBS) হিসেবে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশ। কিন্তু খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে হার ৯.৩২ শতাংশ, আর তা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষজনের প্রাণ স্বভাবতই ওষ্ঠাগত।
অর্থনীতিবিদেরা কী বলছেন?
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (CPD) বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন (Fahmida Khatun) জানিয়েছেন, পরিবহন, কৃষি আর শিল্পের খরচ বাড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। সবচেয়ে বেশি ভুগবে দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। ছোট ব্যবসাও বিপাকে পড়বে। তাঁর মতে, দামের হিসেব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা আর অন্যায্য ভাড়াবৃদ্ধি ঠেকানো… এই দু’টি কাজ এখন সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ (Nazneen Ahmed) বলেছেন, ভর্তুকি কমানোই লক্ষ্য হলে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো যেত। ডিজেল ও কেরোসিনে হাত না দিয়ে পেট্রল-অকটেনে বাড়ালে ভালো হত, কারণ গরিব পরিবার, গণপরিবহন ও শিল্প ডিজেল-কেরোসিনের উপর বেশি নির্ভর করে। একই সময়ে সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো বাড়ানোর ঘোষণাও করেছে সরকার। একসঙ্গে এমন দুই খবরে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (SANEM) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান (Selim Raihan) ফেসবুকে লিখেছেন, মূল্যস্ফীতি সামলানোর সরকারি কৌশল স্পষ্ট নয়। জ্বালানি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আর করের বোঝা নিয়েও কোনও গঠনমূলক আলোচনা নেই বলে তাঁর অভিযোগ।
কলকাতা বনাম ঢাকা
সীমান্তের এ পারের মানুষের কাছে প্রশ্নটা স্বাভাবিক। ঢাকায় তেল এখন কি কলকাতার চেয়ে দামি? সেপ্টেম্বরে কলকাতায় ডিজেল বিকোচ্ছে লিটারপিছু ৯৯.৮২ ভারতীয় টাকায়, পেট্রল ১১৩.৫১ টাকায়।
ডলারের দাম ১২২.৭৬ বাংলাদেশি টাকা ও ৯৫.৫৬ ভারতীয় টাকা, এই হিসেব ধরে অঙ্ক কষলে ঢাকার নতুন দাম ভারতীয় মুদ্রায় দাঁড়ায় ডিজেলে প্রায় ১০৫ টাকা, পেট্রলে প্রায় ১২৫ টাকা। আগের দামে তা ছিল প্রায় ৮৯.৫০ ও ১০৯ টাকা। অর্থাৎ ঢাকার তেল এত দিন কলকাতার চেয়ে সস্তা ছিল। এখন হিসেব উল্টে গিয়েছে। হিসেবটা আনুমানিক, বিনিময় হার বদলালে অঙ্কও পাল্টাবে।
সীমান্ত পেরিয়ে তেল পাচারের আশঙ্কার কথা বলেছিল ঢাকা। এখন বরং উল্টোটা ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হল।
সামনে কী?
সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, দাম বাড়িয়েও ডিজেলে লিটারপিছু ৭০ টাকার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ কোষাগারের চাপ পুরোপুরি কমছে না। বিদ্যুৎ সংকট কাটবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ ও লোহিত সাগরের পরিস্থিতির উপর। মহেশখালীর টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হওয়াও জরুরি। আদানি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ জোগানোর জন্য কোনও সদর্থক পদক্ষেপ করবে কি না, সেটাও বিবেচ্য।
অর্থাৎ, হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই যে অস্থিরতার আবর্তে পড়েছে বাংলাদেশ, সেখান থেকে পরিত্রাণের আশু সম্ভাবনা নেই। বরং অর্থনীতিবিদদের অভিমত, পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলার কোনও ইতিবাচক সমাধানসূত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে নেই। আর তার দায়ে ভুগতে হবে সাধারণ মানুষকেই।




