• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 18 September, 2026

পাকিস্তানে ফের টার্গেট শুক্রবারের প্রার্থনা, কোহাটের মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহত অন্তত ১৬, আহত ৫০

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় কোহাট পুলিশ লাইন্সের মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহত অন্তত ১৬, আহত পঞ্চাশের বেশি। দায় স্বীকার করল জঙ্গি জোট ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন।

পাকিস্তানে ফের টার্গেট শুক্রবারের প্রার্থনা, কোহাটের মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহত অন্তত ১৬, আহত ৫০

16 killed in suicide blast at Pakistan mosque during namaz (Representative Image/@pexels)

শুক্রবারের নামাজ চলাকালীন ফের বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল পাকিস্তান। উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া (Khyber Pakhtunkhwa) প্রদেশের কোহাট জেলায় পুলিশ লাইন্স চত্বরের একটি মসজিদে ঘটল ভয়াবহ আত্মঘাতী বিস্ফোরণ (suicide blast)। পেশোয়ার থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে এই হামলায় প্রাণ গেল অন্তত ১৬ জনের, যাঁদের মধ্যে পাঁচজন পুলিশকর্মী। জখম হয়েছেন পঞ্চাশেরও বেশি মানুষ। খাইবার পাখতুনখোয়ার পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ এই তথ্য জানিয়েছেন।

কী ঘটেছিল

পুলিশ সূত্রে খবর, একটি গাড়ি (explosive-laden vehicle) সরাসরি পুলিশ লাইন্সের গেটে ধাক্কা মারে, তারপরেই হয় বিস্ফোরণ। মনে করা হচ্ছে, ওই গাড়িতে ঠাসা ছিল শক্তিশালী বিস্ফোরক। বিস্ফোরণের অভিঘাতে মসজিদের ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ে, বাইরের রাস্তায় তৈরি হয় গভীর গর্ত। এরপরই শুরু হয় বন্দুকধারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলির লড়াই। জানা গিয়েছে, হামলাকারীদের একটি দল কাউন্টার টেররিজম দপ্তরের দিকে এগোলে তাদের নিষ্ক্রিয় করা হয়, আরেকটি দল হানা দেয় স্পেশাল ব্রাঞ্চ ভবনে, যেখানে ঘটে দ্বিতীয় একটি বিস্ফোরণ। উদ্ধারকারী দলের মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফৈজি জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দল পৌঁছে যায় ঘটনাস্থলে, আহতদের দ্রুত পাঠানো হয় নিকটবর্তী হাসপাতালগুলিতে।

হতাহতের বিবরণ

টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গিয়েছে, ভেঙে পড়া দেওয়ালের ধ্বংসস্তূপ থেকে বাসিন্দারা নিজেরাই আহতদের টেনে বের করছেন। জেলা সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপারিন্টেন্ডেন্টের বক্তব্য, পনেরোটি মৃতদেহ এবং পঞ্চাশ জনের বেশি আহতকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। মৃতদের অধিকাংশই ছিলেন প্রার্থনায় হাজির হওয়া সাধারণ মানুষ। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের।

হামলার দায়

এই হামলার দায় স্বীকার করেছে তুলনামূলক ভাবে নতুন একটি জঙ্গি জোট, ইত্তেহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান (Ittehad-ul-Mujahideen Pakistan, সংক্ষেপে IMP)। ২০২৫ সালের এপ্রিলে হাফিজ গুল বাহাদুর গোষ্ঠী (Hafiz Gul Bahadur Group), লস্কর-ই-ইসলাম (Lashkar-e-Islam) এবং হারাকাত-ই-ইনকিলাব-ই-ইসলামি (Harakat-e-Inqilab-e-Islami), এই তিনটি জঙ্গি সংগঠন হাত মিলিয়ে তৈরি করেছিল এই জোট। পাকিস্তানি তালিবানের ভাঙা অংশ থেকে জন্ম নেওয়া এই জোটের নেতৃত্বে আছেন হাফিজ গুল বাহাদুর নিজেই, যিনি পরিচিত পাকিস্তানি তালিবানের এক প্রভাবশালী কমান্ডার হিসেবে।

সন্ত্রাসের পুরনো ছায়া

কোহাট এবং সংলগ্ন এলাকা পাকিস্তানের সবচেয়ে অস্থির জঙ্গি-উপদ্রুত অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম। ২০১০ সালে এই একই পুলিশ লাইন্সের পিছনে থাকা একটি পুলিশ কলোনিতে রিমোট-কন্ট্রোল্ড বোমা হামলায় প্রাণ গিয়েছিল প্রায় কুড়ি জনের, যাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন পুলিশকর্মীদের পরিবারের সদস্য। চলতি বছরের অগস্টে গোয়েন্দারা দাবি করেছিলেন, ঠিক এই পুলিশ লাইন্স চত্বরের মসজিদেই হামলার ছক কষছিল একটি জঙ্গি নেটওয়ার্ক, যা তারা আগেভাগে নস্যাৎ করে দিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। এবার সেই আশঙ্কাই সত্যি হল।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

হামলার নিন্দা করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, তিনি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তলব করেছেন এবং ত্রাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সল করিম কুন্দিও নিন্দা জানিয়ে আহতদের সুস্থতা কামনা করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভিও এই হামলাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছেন। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারিও এর আগে এই ধরনের হামলার প্রেক্ষিতে বিদেশ-মদতপুষ্ট সন্ত্রাস নির্মূলের অঙ্গীকার করেছিলেন।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট, কেন বাড়ছে হামলা

গত কয়েক বছরে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং সংলগ্ন উপজাতীয় এলাকায় জঙ্গি হামলা লাগাতার বেড়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সেনা কনভয়ে আত্মঘাতী হামলায় প্রাণ গিয়েছিল তেরো জন সেনার, সেই হামলার দায়ও নিয়েছিল হাফিজ গুল বাহাদুর গোষ্ঠী। আফগানিস্তান সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় পাকিস্তানি তালিবানের বিভিন্ন অংশ ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলির সক্রিয়তা প্রশাসনের কাছে দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন ছোট ছোট জঙ্গি গোষ্ঠীর একত্রিত হয়ে বড় জোট তৈরি করার প্রবণতা এই অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

কোহাটের এই হামলা ফের একবার প্রমাণ করে দিল, পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর লড়াই এখনও কতটা কঠিন।