৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি নতুন প্রস্তাব পাশ হয়েছে। সদস্যদেশগুলো বিপুল ভোটে এ প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার, স্কুল ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ধরনের মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ নামের এই মানচিত্রগুলোতে আফ্রিকার প্রকৃত আকার যাতে সঠিকভাবে ফুটে ওঠে, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে ষোড়শ শতকের মানচিত্র সংক্রান্ত মারকেটর ধারণার বিরুদ্ধে আফ্রিকার দেশগুলোর দীর্ঘ আন্দোলনের এটি বিরাট সাফল্য।
আসুন দেখে নেওয়া যাক কি এই মারকেটর প্রোজেকশন? বিশ্বকে আমরা যেভাবে দেখি, তা নির্ধারণ করে মানচিত্র— বিষয়টি আমাদের জানা। ইউরোপীয় নাবিকদের সুবিধার জন্য ষোড়শ শতকে যে মানচিত্র তৈরি করা হয় তা এখনও প্রচলিত। ইউরোপীয় ভূগোলবিদ ও মানচিত্রকর গেরার্ডাস মারকেটর ১৫৬৯ সালে এটি তৈরি করেন। সোজা পথে দিকনির্ণয় করার জন্য এই মানচিত্র দারুণ কার্যকর ছিল। কিন্তু বিষুবরেখা থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির আকার বাড়তে থাকে। ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্ট।
গ্রিনল্যান্ড আর আফ্রিকার আকার প্রায় সমান বলে এই মানচিত্রে মনে হয়। অথচ আফ্রিকা মহাদেশ গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় ১৪ গুণ বড়। উত্তর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেও একইভাবে অনেক বড় করে দেখানো হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বিকৃত মানচিত্র মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি করেছে। আফ্রিকার প্রতীকী সংকোচন ঘটিয়ে বিশ্ব সম্পর্কে একটি ভারসাম্যহীন ধারণা তৈরি করে আফ্রিকার আকার ছোট করে দেখানোর প্রবণতা নিয়ে আছে তীব্র বিতর্ক। এই বৈষম্য দূর করতে রাষ্ট্রসংঘের এই প্রস্তাব সত্যিই ঐতিহাসিক।
এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের সঠিক আকার দেখানো। কেননা আগেকার মানচিত্রে বিকৃতির কারণে মানুষের মনে আফ্রিকার মত একটি বিশাল মহাদেশকে ছোট ও কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবার একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। যদিও পৃথিবী গোল হওয়ায় সমতল কাগজে তাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। প্রতিটি মানচিত্রে ক্ষেত্রফল, আকার বা দূরত্বের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিতে হয়। তাই, মারকেটর প্রজেকশন পুরো পৃথিবীর মানচিত্র দেখানোর জন্য মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়। কারণ, এতে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পরিমাপ বিকৃত হয়ে যায়। ফলে বিষুবরেখা থেকে দূরের দেশগুলো কাছের দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বড় দেখায়। এ জন্য মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে বিশাল দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের চেয়েও বড় ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সমান দেখায়। অথচ বাস্তবে গ্রিনল্যান্ড হলো মধ্য আফ্রিকার ছোট্ট দেশ ডি আর কঙ্গো-র সমান। ভূগোল গবেষকদের মতে, এই মানচিত্র এতকাল ধরে টিকে থাকার পেছনে একটি অদৃশ্য কারণ রয়েছে। এটি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো পশ্চিমা বিশ্বকে একদম কেন্দ্রে ফুটিয়ে তোলে, যা একধরনের মানসিক আধিপত্য বজায় রাখায় সাহায্য করে। নতুন প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মানচিত্রের এই ভুল আকারের কারণে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াকে বাস্তবে অনেক ছোট মনে করা হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে এই অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। এই বিকৃতি শুধু ভূগোলেই সীমাবদ্ধ নয়। এই মানচিত্র মূলতঃ আফ্রিকার অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রকৃত সমৃদ্ধিকে ছোট করে দেখার মানসিকতাও তৈরি করে।
আফ্রিকা ইউনিয়নের সমর্থনে এ আলোচনার নেতৃত্ব দেয় টোগো দেশটি। তাদের বিদেশমন্ত্রী রবার্ট ডাফে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি বক্তব্যের মাধ্যমে জানান যে মারকেটর মানচিত্রের উপযোগিতাকে তাঁরা অস্বীকার করছেন না। কিন্তু একটি ন্যায্য মানচিত্র বিশ্বের ভূগোল পরিবর্তন করে না। কিন্তু এটি বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।’ যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করেন। অন্যদিকে ফ্রান্স সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। ভোটাভুটি শুরুর ঠিক আগে ফরাসি বিদেশমন্ত্রীর বিবৃতিতে জানা যায় যে ফরাসি সরকার বিশ্ব মানচিত্র থেকে মারকেটর প্রজেকশন বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
ভোটের লড়াইয়ে প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে ১৬৪টি ভোট। বিপরীতে মাত্র একটি দেশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ওয়াশিংটন এ উদ্যোগকে একটি উগ্র মতাদর্শিক প্রকল্প বলে অভিহিত করে। এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত থাকে। ইউক্রেন এ উদ্যোগকে সমর্থন করলেও কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনে ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চল যেভাবে দেখানো হয়, তা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও সীমান্ত বা সার্বভৌমত্বের সঙ্গে এই মানচিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
নতুন এই প্রস্তাবে ঐতিহাসিক অন্যায্যতার বিচার ও স্মারক ক্ষতিপূরণের প্রতীক হিসেবে মারকেটর প্রজেকশনের বদলে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। যাতে বিভিন্ন দেশের প্রকৃত আয়তন ও ক্ষেত্রফলকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। নতুন এ প্রস্তাবের ফলে পুরোনো বহুল প্রচলিত মারকেটর মানচিত্র কিন্তু পুরোপুরি নিষিদ্ধ হচ্ছে না। তবে সম-আয়তনের মানচিত্র বা ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন সিস্টেমটি ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। স্কুল, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই মানচিত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। সমতল মানচিত্রের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দিতে বলা হয়েছে।
২০১৮ সালের উত্তর আমেরিকান কার্টোগ্রাফিক ইনফরমেশন সোসাইটি সম্মেলনে প্রথম এই ‘ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন’ সিস্টেমটি তুলে ধরা হয়েছিল। এই মানচিত্রে ইউরোপকে কিছুটা ছোট, ব্রাজিলকে প্রসারিত ও গ্রিনল্যান্ডকে অনেকটাই ছোট দেখায়। আর তার বিপরীতে আফ্রিকাকে দেখা যায় অনেক বৃহৎ ও সুস্পষ্টভাবে। চলতি বছরের মার্চ মাসে আফ্রিকান ইউনিয়ন ‘ইকুয়াল আর্থ ম্যাপ’ গ্রহণ করে। এরপর এপ্রিল মাসে টোগো আফ্রিকান ইউনিয়নের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রসংঘের অন্য সদস্যদেরও একই পথ অনুসরণের আহ্বান জানায়। তারই ধারাবাহিকতায় এই খসড়া প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়। জুলাই মাসে সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এই ভোটাভুটি হয়।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি অভিনব তথ্য জানাতেই হবে। দক্ষিণ গোলার্ধের ওশেনিয়া মহাদেশের ছোট্ট দেশ নিউজিল্যান্ডও দীর্ঘদিন ধরে মারকেটর মানচিত্র নিয়ে আপত্তি তুলে আসছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নকে নিয়ে তৈরি একটি মজার পর্যটন বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বিশ্ব-মানচিত্রের এক কোনায় অবস্থান হওয়ায় নিউজিল্যান্ড যেন বিশ্বের মানচিত্র থেকেই গায়েব হয়ে যাচ্ছে।
ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন এই সমস্ত সংকটের সহজ সমাধান হতে চলেছে। প্রস্তাবিত এই মানচিত্রের বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে, যার একটিতে লন্ডনের গ্রিনিচের বদলে ওশেনিয়া অঞ্চলকে কেন্দ্রে রেখে পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ এতকাল ধরে বিশ্ব সময় ও মানচিত্রের কেন্দ্রীয় বিন্দু হিসেবে গ্রিনিচকেই আদর্শ ধরা হতো। গুগল ম্যাপসের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখনও মারকেটর প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে চলে। তাই খসড়া প্রস্তাবে এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রসংঘ ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে মিলে আরও নিখুঁত মানচিত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।




