পহেলগামে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা করেছে ব্রিকস। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস বৈঠকের ঘোষণায় ২৬ জনের প্রাণহানির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে যুক্ত এবং যারা তাদের সমর্থন করে, তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও কূটনৈতিক জয়।
পহেলগামের বৈসরন উপত্যকায় নিরীহ পর্যটকদের উপর যে নৃশংস হামলা হয়েছিল, তা শুধু ভারতের নিরাপত্তার উপর আঘাত ছিল না, এটি ছিল মানবতার উপর আঘাত। ২৬ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হামলার লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে হত্যা করে ভারতীয় সমাজে ভয় ও বিভাজন তৈরি করা। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বরং পহেলগাম-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ব্রিকসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে পহেলগাম হামলার নিন্দা তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান এক নয়। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের প্রশ্নে চিনের অবস্থান সবসময়ই ভারতের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। ফলে এই মঞ্চে পহেলগামের মতো একটি নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তাদের মদতদাতাদের জবাবদিহির কথা বলা ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাফল্য বলেই বিবেচিত হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, ব্রিকসের ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র কথা বলা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদকে কোনও ধর্ম, জাতীয়তা, সভ্যতা বা জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত না করার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসে অর্থ জোগান এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু সন্ত্রাসীকে চিহ্নিত করলেই হবে না, তার পিছনে থাকা অর্থ, আশ্রয় ও পরিকাঠামোকেও বন্ধ করতে হবে।
ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ঠিক এই বিষয়টিই— সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা ও নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া। পহেলগাম হামলার তদন্তে পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈবা এবং তার প্রক্সি সংগঠনের ভূমিকার কথা সামনে এসেছে। ফলে ব্রিকস ঘোষণার ভাষা ভারতের সেই অবস্থানের সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ব্রিকসের সন্ত্রাসবিরোধী কর্মগোষ্ঠী এবং তার বিভিন্ন উপ-গোষ্ঠীকে আরও কার্যকর করতে হবে। সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের অর্থের উৎস বন্ধ করা, তাদের নিরাপদ ঘাঁটি নির্মূল করা এবং সাইবার দুনিয়া ও নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ভারতের বক্তব্যও সেখানেই— সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু কথায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে।
পহেলগাম হামলার জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছিল। এরপর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে তীব্র সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ থামলেও সন্ত্রাসবাদের মূল সমস্যাটি থেকেই গিয়েছে।
ব্রিকসের ঘোষণায় তাই ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল নৈতিক অবস্থানের স্বীকৃতি। ভারত বহুদিন ধরেই বলে আসছে— সন্ত্রাসবাদীর কোনও ধর্ম নেই, কিন্তু সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় ও মদত দেওয়ার দায়ও এড়ানো যায় না। পহেলগামের নৃশংসতার পর সেই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরালো হয়েছে।
অবশ্যই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনও ঘোষণাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। কিন্তু যখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলি একসঙ্গে বলে যে সন্ত্রাসী এবং তাদের সমর্থনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, তখন সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ কমে যায়। পহেলগাম তাই শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার স্মৃতি নয়, ব্রিকসের ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের ন্যায়সঙ্গত অবস্থানেরও এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিতে পরিণত হয়েছে। ভারতের এই নৈতিক জয়কে এখন কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পরিণত করাই পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত।




