• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 6 September, 2026

কুড়িটি আঙুল খেলছে ভাতের হাঁড়িতে

বড়ো বড়ো গরাস পাকিয়ে মুখে দাও৷ এই দেখো আমরা যেমন করে খাচ্ছি তেমন করে...! আহা! কেঁকে নাও৷ ভাত কেঁকে নিতে হয়৷ ওই যে জমাট দলা উঠে আসে ওটাকে বলে ভাতের ক্ষীর৷ টপাস করে মুখে দিয়ে ফেলো সোনা৷ এই দেখো আমরাও কেঁকে খাচ্ছি৷ ভাতের হাঁড়িতে কুড়িটি আঙুল খেলছে! অতগুলো হাতের ধাক্কায়, হাঁড়ি কাঁকার আওয়াজ তীব্র বড়ো৷

কুড়িটি আঙুল খেলছে ভাতের হাঁড়িতে

File Photo

এমন বর্ষায় ছোটোবেলায় খুব প্রিয় ছিল ফ্যানাভাত আর ডিম আলু ভাতে৷ যেদিন ডিম জুটত না, সেদিন শুধু আলু৷ এবার ‘জুটত না’ শব্দটা পরিষ্কার করি৷ আমাদের সময় বাপ-মায়েরা সবসময় সন্তানের পাতে সেরা দিতে রাজি হতেন না৷ বরং চেষ্টা করতেন, শিশু যাতে সংসারের কোনও না কোনও কিছুর না থাকাটাকে বোঝে! ঠিক বড়োদের মতো করে বোঝে এবং দুঃখুটাকে বড়োদের সঙ্গে সমানে ভাগ করে চলতে শেখে৷ তাই কখনও কখনও ইচ্ছে করেই ডিম দেওয়া হতো না৷ একটা ডিমের বদলে দেড়টুকরো আলু খোসাশুদ্ধু, নুন, সর্ষের তেল আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখা৷ সারা থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাত ছড়িয়ে থাকত৷ একপাশে আলুর দলা৷ আমি এখনও এই আলুভাতেকে ‘তাল আলু’ বলি৷ কেন কে জানে! হয়ত নিটোল গোল বলে৷ এখন গোবিন্দভোগের ফ্যানাভাত হয়৷ আমরা খেতাম খুদের চালের ভাত৷ তাই সুগন্ধ থাকত না৷ তবে ভাতের গন্ধ ম-ম করত৷

হাপুস হুপুস খেতাম৷ পেট ঠেসে খেতাম৷ আর খুব তাড়াতাড়ি খাওয়ার চেষ্টা করতাম৷ যেন ভাতের সঙ্গে ধোঁয়াটাও খেয়ে ফেলব! আমাদের সময় এই ভাত হাঁড়িতে রান্না হলেও, আমাদের বাবা-কাকাদের সময় লোহার কড়াইয়ে ফুটত ফ্যানা৷ গ্রামে একটা কথা চলিত আছে— ভাত ফুটছে দেখতে পেলে আর ফোটার টগবগ আওয়াজ শুনতে পেলে নাকি চোখ কানের পুণ্যি হয়৷ ধানের অধিকারী মানুষগুলো অবশ্য ধানকেই পুণ্য মনে করে৷ যার বাড়ি ভাত ফোটে না, সে যেন জীবনভর পাপী হয়ে থাকবে— এই হল গে পৃথিবীর সম্পদশালীদের বিধান৷
আমাদের গ্রামের বাড়ি দন্ডীরহাট৷ ৭৮সি বাসে সেখানে পৌঁছতে প্রতিবারই বেলা গড়িয়ে আসত৷ শহরে থেকে থেকে তখন পাউরুটি খুব চিনেছি৷ ফলে বিকেলে পৌঁছে ভাত খেতে চাইতাম না৷ গ্রামে থাকতেন ছোটো ঠাকুমা, মেজদিদা৷ তাঁদের কিন্তু বরাবর ভাতকে ঈশ্বরের সম্মান দিতে দেখেছি৷ বলতেন– মানুষের ভাতের বেলা গড়ায় না৷ পেটে দিলেই আত্মাশান্তি৷ কিছু শব্দের মানে বুঝতে মানুষের গোটা জীবন পেরিয়ে যায়৷ আত্মাশান্তি আমার কাছে তেমনই এক শব্দ৷ তখন অবশ্য ভাত আর আত্মা মিলিয়ে ভাবতাম, ভাত বোধহয় পেটে নয়, মানুষের বুকে হেঁটে বেড়ায়৷

সেবার দন্ডীরহাট যাবার সারাটা পথ মেঘে ঢাকা৷ আমতলা নামতেই ঝেঁপে বৃষ্টি৷ বাড়ি ঢুকতেই গ্রামের কাকা, পিসি সবাই বললে— আগে ভাত খেয়ে নে৷ এক্ষুনি হয়ে যাবে গরম গরম ভাত৷ ফ্যানা ভাত এল৷ সঙ্গে আলু, কাঁঠাল বিচি ভাতে৷ ডিম নেই বলে চেঁচামেচি করছি৷ সবাইকে ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছি— হায় হায়, বাড়ির একটা মাত্তর মেয়ে আমি! যাও না বাপু, বাগান থেকে ডিম খুঁজে আনো! এমন সময় দেখি, জামরুলতলা দিয়ে হেঁটে আসছে বামুনদিদির চার মেয়ে৷ ওদিকে বোধহয় আমাদের বাড়ির আরেকটি দুয়োর ছিল৷ তার গায়েই ছিল বামুনদির মাটির ঘর৷ সিঁথিতে সিঁদুর থাকলেও জনম তাঁর দারিদ্র্যের হাত থেকে একদিনের জন্যও মুক্তি পায়নি৷ তাঁর বরকে দেখিওনি কোনোদিন৷ গরিব বউদের বর দেখার ইচ্ছে কেন যে হয় না!

যাই হোক, সেদিন আমার ভাতের থালার থেকে খুব সামান্য দূরত্বে এসে বসল চার বামুনমেয়ে৷ তারা আমার বয়সী৷ কেউ কেউ আমার থেকে ছোটো৷ তবু বড়োদের মতো করে আমায় ভোলাবার চেষ্টা করলে…
ও গালু মনা (আমার ডাক নাম), ও সোনা, কাল তোমায় ডিম এনে দেব৷ আজ কাঁঠালবিচি আলুসেদ্ধ দিয়ে খেয়ে নাও ভাত৷ এ কাঁঠাল হলো রানি কাঁঠাল৷ ফলের চেয়ে বিচির স্বাদ বেশি৷
আমার আঙুল নড়ছে ভাতের ওপর!
তাদের সুর চলছে…

এই তো বড়ো বড়ো গরাস পাকিয়ে মুখে দাও৷ এই দেখো আমরা যেমন করে খাচ্ছি তেমন করে…! আহা! কেঁকে নাও৷ ভাত কেঁকে নিতে হয়৷ ওই যে জমাট দলা উঠে আসে ওটাকে বলে ভাতের ক্ষীর৷ টপাস করে মুখে দিয়ে ফেলো সোনা৷ এই দেখো আমরাও কেঁকে খাচ্ছি৷ ভাতের হাঁড়িতে কুড়িটি আঙুল খেলছে! অতগুলো হাতের ধাক্কায়, হাঁড়ি কাঁকার আওয়াজ তীব্র বড়ো৷

বহুকাল বাদে ‘অশনি সঙ্কেত’ দেখেছি৷ আলপথ ধরে সার বেঁধে আসছে ক্ষুধার্ত মানুষ৷ অদ্ভুত দৃশ্যায়ন৷ একটি মানুষই একটি লাইন৷ এরকম কেন লম্বা লাগে মানুষকে! কোন দেশের এরা? দেবে যাওয়া পেটের মানুষ হিঁচড়েপিচড়ে চলে৷ লম্বা৷ ভীষণ লম্বা৷ মহিমান্বিত নির্দেশক সত্যজিৎ রায়৷ সঙ্কেত তাঁর অব্যর্থ!

থ্যাংকস রে বৃষ্টি! শতবার সশব্দে ঝরেও শব্দ গুলিয়ে দিসনি৷