পুজোর মরসুম দোরগোড়ায়। ঠিক এই সময়েই ব্যাঙ্কের দরজায় তালা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হল দেশজুড়ে। সরকারি ব্যাঙ্কের কর্মী ও আধিকারিকদের যৌথ মঞ্চ ইউনাইটেড ফোরাম অফ ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস (United Forum of Bank Unions বা UFBU) সেপ্টেম্বর মাসে পরপর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এর জেরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়তে পারে টানা কয়েক দিন।
কবে কবে বন্ধ
সংগঠনের ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম দফায় আগামী ১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার একদিনের ধর্মঘট হবে। মুশকিল হল, তার পরের দিনই অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় শনিবার, যা এমনিতেই ব্যাঙ্কের ছুটি। তার উপর ১৩ সেপ্টেম্বর রবিবার। ফলে শুক্র, শনি, রবি মিলিয়ে টানা তিন দিন ব্যাঙ্কের ঝাঁপ বন্ধ থাকার সম্ভাবনা। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে, কারণ ৪ সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাজ্যে ব্যাঙ্ক এমনিতেই বন্ধ থাকছে। দ্বিতীয় দফায় ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, টানা তিন দিনের ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। ব্যাঙ্ক কর্মী সংগঠনগুলি আরও জানিয়েছে, দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যেতে পারে তারা।
ক্ষোভের কারণ
নয়টি ব্যাঙ্ক কর্মী ও আধিকারিক সংগঠনের মঞ্চ ইউএফবিইউর দাবি, দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাঙ্ক কর্মী তাদের ছাতার তলায় রয়েছেন। তাদের প্রধান দাবি, সপ্তাহে পাঁচ দিনের কর্মসংস্কৃতি (five-day banking week) চালু করা। ২০২৪ সালের ৮ মার্চ যে বেতন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাতে কর্মীরা প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪০ মিনিট কাজ করার বিনিময়ে সপ্তাহে ২ দিন ছুটির শর্তে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ২ বছর পার হয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক এখনও সেই প্রস্তাবে সিলমোহর দেয়নি বলে অভিযোগ সংগঠনের। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI), এলআইসি (LIC), জিআইসি (GIC), নাবার্ডের (NABARD) মতো প্রতিষ্ঠানে যেখানে পাঁচ দিনের কাজের নিয়ম চালু, সেখানে সাধারণ ব্যাঙ্ক কর্মীরা কেন বঞ্চিত, প্রশ্ন তুলেছে ইউএফবিইউ।
দ্বিতীয় ক্ষোভের কারণ পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেন্টিভ (Performance Linked Incentive বা PLI) প্রকল্প। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের অধীন আর্থিক পরিষেবা দপ্তরের নির্দেশে স্কেল-৪ থেকে স্কেল-৭ পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ হাজার শীর্ষ আধিকারিক বছরে সর্বোচ্চ ৩৬৫ দিনের বেতনের সমান ইনসেন্টিভ পেতে পারেন। অথচ বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ কর্মী-আধিকারিকের ভাগ্যে জোটে সর্বোচ্চ মাত্র ১৫ দিনের বেতন। এই বৈষম্যই মূল বিতর্কের কেন্দ্রে। ইউএফবিইউর বক্তব্য, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশনের (IBA) সঙ্গে হওয়া সমঝোতায় ঠিক হয়েছিল, ইনসেন্টিভ নির্ভর করবে গোটা ব্যাঙ্কের সার্বিক পারফরম্যান্সের উপর এবং সব স্তরের কর্মীদের জন্য এক নিয়মে। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। বিষয়টি বর্তমানে চিফ লেবার কমিশনারের কাছে আলোচনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, পাশাপাশি দিল্লি হাই কোর্টেও (Delhi High Court) মামলাটি বিচারাধীন।
অন্যদিকে পেনশন সংক্রান্ত একাধিক পুরনো দাবিও ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পেনশন আপডেট এবং পেনশনভোগীদের জন্য অভিন্ন মহার্ঘ ভাতা কাঠামোর দাবি।
পরিষেবায় প্রভাব
সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, ধর্মঘটের দিনগুলিতেও গ্রাহক পরিষেবার সময়সীমায় কোনও পরিবর্তন হবে না। তবে বাস্তবে সরকারি ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতে কর্মী উপস্থিতি কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, ফলে চেক ক্লিয়ারিং, নগদ জমা-তোলা কিংবা ঋণ সংক্রান্ত কাজে ভোগান্তির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। যদিও এটিএম (ATM), ইউপিআই (UPI) এবং নেট ব্যাঙ্কিং পরিষেবা স্বাভাবিক থাকার কথা।
পুজোর মুখে বাড়তি চাপ
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে সময়টাই বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পুজোর কেনাকাটা এবং বোনাস তোলার মরসুমে টানা কয়েক দিনের ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকা রাজ্যের ছোট ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ গ্রাহক, সকলের জন্যই বাড়তি সমস্যার কারণ হতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানসূত্র বেরোয় কিনা, তার উপরই নির্ভর করছে সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের ধারাবাহিক ধর্মঘট এড়ানো যাবে কিনা।




