একটি প্ল্যাকার্ড হাতে কয়েক মুহূর্তের ছবি। সেই ছবিকে ঘিরেই রাজ্যের বিভিন্ন থানায় একের পর এক এফআইআর। এবার সেই ‘এফআইআর-ঝড়’ থেকে মুক্তি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। তাঁর দাবি, একটি ঘটনার ভিত্তিতে বিভিন্ন থানায় পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করে তাঁকে কার্যত ফৌজদারি প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
২৪ জুলাই ছাত্র ও নাগরিক সমাজের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন অভিনেত্রী। নিট-সহ শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়মের প্রতিবাদ এবং স্বচ্ছতার দাবিতে সিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার দিকে মিছিল হয়েছিল। সেখানে ছাত্র, শিক্ষক, শিল্পী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছিলেন তিনি।
অভিনেত্রীর দাবি, মিছিলের ভিড় এবং পুলিশের হস্তক্ষেপের সময় আচমকাই তাঁর হাতে একটি প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ব্যঙ্গচিত্র ছিল বলে অভিযোগ। কিন্তু সেই প্ল্যাকার্ডে কী রয়েছে, তা না দেখেই কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি সেটি হাতে নিয়েছিলেন বলে দাবি শ্রীলেখার।
হাইকোর্টে দায়ের করা আবেদনে স্পষ্ট ভাবে তিনি জানিয়েছেন, ওই কার্টুন তিনি আঁকেননি, তৈরি করেননি, ছাপাননি, প্রকাশ করেননি কিংবা প্রচারও করেননি।
এর পরেই পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়। অভিনেত্রীর প্ল্যাকার্ড হাতে ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, সেই ছবি কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের আহ্বান জানিয়ে সমাজমাধ্যমে প্রচার শুরু হয়। আবেদনে এমনই একাধিক পোস্টের উল্লেখ করেছেন শ্রীলেখা।
কোনও কোনও পোস্টে বিভিন্ন থানায় অভিযোগ দায়েরের কথা বলা হয়। আবার কোথাও দাবি করা হয়, তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই ৫৩টিরও বেশি এফআইআর হয়েছে এবং আরও মামলা দায়ের হতে পারে।
চ্যাটার্জীহাট থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় বিএনএস-এর ৩৫২, ৩৫৩(২) এবং ৩৫৬(৩) ধারায় মামলা করা হয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তাঁর বক্তব্য, যে ঘটনার ভিত্তিতে মামলা, সেখানে হামলা, হিংসা, সরকারি কর্মীকে কাজে বাধা দেওয়া কিংবা হিংসায় প্ররোচনা দেওয়ার মতো কোনও কাজ তিনি করেননি।
এক ঘটনা, একাধিক এফআইআর—কেন?
শ্রীলেখার মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, একই ঘটনা এবং একই ছবিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন থানায় কী ভাবে পৃথক পৃথক ফৌজদারি মামলা চলতে পারে?
তাঁর দাবি, একই ঘটনার জন্য বার বার এফআইআর এবং বিভিন্ন থানায় হাজিরার নোটিস কার্যত অসম্ভব পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিএনএস-এর ৩৫(৩) ধারায় একের পর এক নোটিস আসায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে তদন্তে হাজিরা দেওয়া তাঁর পক্ষে কার্যত দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।
যদিও তিনি দাবি করেছেন, তদন্তে সহযোগিতা করেছেন এবং প্রয়োজনে এফআইআর ও অভিযোগের কপি চেয়ে নিয়ে তবেই হাজির হয়েছেন।
‘তদন্ত নয়, তদন্তের প্রক্রিয়াই শাস্তি হয়ে উঠছে’
হাইকোর্টে অভিনেত্রীর সবচেয়ে মানবিক আবেদনগুলির একটি—একই অভিযোগ ঘিরে বার বার থানায় হাজিরা, নোটিস এবং মামলা তাঁর স্বাভাবিক জীবন ও পেশাগত কাজকে বিপর্যস্ত করছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি মামলা এবং বার বার ব্যক্তিগত হাজিরার নির্দেশের ফলে তদন্তের প্রক্রিয়াই তাঁর কাছে শাস্তির মতো হয়ে উঠেছে।
তাঁর আরও বক্তব্য, এই ধরনের একাধিক ফৌজদারি মামলা মানুষের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকারেও ‘চিলিং এফেক্ট’ তৈরি করতে পারে।সংবিধানের ১৪, ১৯ এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
অভিনেত্রীর দাবি, ঘটনার পর তিনি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। ছাত্রদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এবং কোনও সাংবিধানিক পদাধিকারীকে অপমান করার অভিপ্রায় তাঁর ছিল না বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সব এফআইআর খারিজ, নাকি এক তদন্তের আওতায় আনার আবেদন
হাইকোর্টের কাছে শ্রীলেখার প্রধান আবেদন, ২৪ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া সমস্ত এফআইআর, অভিযোগ, জেনারেল ডায়েরি এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত খারিজ করা হোক।বিকল্প ভাবে তাঁর আবেদন, সমস্ত অভিযোগকে একটি মাত্র তদন্তের আওতায় এনে একটি নির্দিষ্ট থানাকে বা তদন্তকারী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হোক। অন্য থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগগুলিকে পৃথক মামলা হিসেবে না দেখে একই ঘটনার তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার আবেদনও করেছেন তিনি।




