সরকারে যে দলই থাকুক না কেন, স্বাস্থ্য নিয়ে খবরের শিরোনাম সবচেয়ে বেশি। মালদহ মেডিক্যাল কলেজে ১০ দিনে ৮০টি শিশুর মৃত্যু নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ক্ষুব্ধ। সরকারি হাসপাতালে গ্রুপ ডি স্টাফ ফার্মাসিস্টের কাজ করছেন দেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জী রেগে আগুন। এসব ২৮ আগস্ট দৈনিক স্টেটসম্যানের খবরের শিরোনাম। কোনোটাই নতুন কিছু নয়। অতীতে কলকাতার সরকারি বিধানচন্দ্র রায় শিশু হাসপাতালে শিশুমৃত্যু নিয়ে রাজনীতি সব দলই করেছে। পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার জেলায় জেলায় এনআইসিইউ, এসএনসিইউ খুলেছিল, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে শিশুমৃত্যু খুব বেশি কমেনি। রেফারের সংখ্যাও কমেনি। গর্ভাবস্থায় মায়েদের দেখাশোনা এবং প্রসবকালীন ও পরবর্তী চার সপ্তাহে সর্তকতায় খামতি থাকলে, আরও মনোযোগ ও সর্তকতা প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালের পরিচালনায় নিয়োজিত ডাক্তাররা স্বীকার না করলেও সবাই জানেন হাসপাতাল কাদের দিয়ে কীভাবে চলে। ডাক্তার, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, গ্রুপ-ডি, সাফাইকর্মী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পদ পূরণ হয়ে গেলে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার হাল ফিরবে বলে স্বাস্থ্যপ্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা মাঝে মাঝে বলে থাকেন এবং আমজনতাও মনে-প্রাণে হয়তো বিশ্বাস করেন, কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা দীর্ঘ চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতায় বিলক্ষণ জানেন এমনটা মোটেও হবার নয়।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে সরকারি হাসপাতালের অবস্থা বিশেষ করে সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হাল এখনকার চেয়ে অনেক ভালো ছিল। কারণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে মেডিক্যাল শিক্ষার মান, প্রশিক্ষণ ও হাতেকলমে চিকিৎসার সুযোগ এবং শিক্ষার আন্তরিক একাগ্রতা অনেকগুণ বেশি ছিল। এখন সেই সুযোগ অনেকটা সীমিত। অতীতে শিক্ষক ডাক্তাররা ছাত্র পড়ানো ছাড়াও হাসপাতালে রোগীপিছু অনেকটা সময় দিতেন, বিকেল তিনটের আগে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে দেখিনি কাউকে। তখনও প্রায় সব ডাক্তারই সন্ধ্যাবেলায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতেন, কিন্তু হাসপাতাল থেকে জরুরি ডাক পেলে সশরীরে হাসপাতালে এসে হাজির হতেন। বর্তমানে ভালো শিক্ষক তৈরিতে সরকার তেমনভাবে উৎসাহ দিচ্ছে না। শিক্ষকের পদ অনেকবেশি আর্কষণীয় করা প্রয়োজন। তখনকার সময়ে এখনকার মতো আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার যেমন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি ছিল না। কিন্তু এক্সরে, ইসিজি, রক্তপরীক্ষায় কোনও ঘাটতি ছিল না, দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হতো না।
পশ্চিমা দেশের তুলনায় আমাদের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না, কিন্তু রোগীদের দক্ষিণ ভারতে যাওয়ার প্রবণতা ছিল না বললেই চলে। প্রাইভেট নার্সিংহোমের সংখ্যাও ছিল এখনকার তুলনায় অনেক কম। তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা বলতেন ‘ডাক্তাররা গ্রামে যায় না’৷ ১৯৭৬ সালে গ্রামের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ৪০০ পদের জন্য ১৬০০ দরখাস্ত জমা পড়েছিল। বর্তমানে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য ১২২৭ জন জিডিএমও পোস্টের জন্য প্রায় ৮০০০ ডাক্তার আবেদন করে বসে আছেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে একটু ধীরগতিতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে বছর দুয়েক সময় লাগতে পারে। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে ডাক্তারের অভাব আছে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা বোধহয় বাস্তব পরিসংখ্যান ঠিক জানেন না। এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় অনুধাবনযোগ্য যে, শয়ে শয়ে কলকাতার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা সপ্তাহে এক বা দু’দিন
দূর-দুরান্তের ওষুধের দোকানে ‘চেম্বার’ করে চলেছেন। মফস্বলের মানুষেরা সবাই জানেন। অতএব বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাও গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত উপার্জনের কারণে সহজলভ্য। সম্প্রতি সরকার কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চুক্তির ভিত্তিতে আংশিক সময়ের জন্য নিয়োগ করার কথা ভাবছে।
সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা ‘পরিসরে’ অনেকটা এগিয়েছে, কিন্তু ‘মান, কর্মক্ষমতা এবং ধারাবাহিকতায়’ এখনও অনেকটা উন্নতির স্তরে পৌঁছয়নি। আমাদের রাজ্যের ডাক্তারদের ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্রমশ কমেছে এবং বেড়েছে দক্ষিণ ভারতের প্রতি। মধ্যবিত্ত পরিবারে এমন কোনও বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখান থেকে কেউ চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ ভারতে একবারও যাননি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, এক শ্রেণীর দালাল চক্র বা এজেন্সি এখানে গড়ে উঠেছে যারা অল্পবয়সী বা অনামী ডাক্তার দক্ষিণ ভারত থেকে প্রতি সপ্তাহে উড়িয়ে এনে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চেম্বার করাচ্ছে— যাঁদের নাম পশ্চিমবঙ্গের মেডিক্যাল কাউন্সিলে নথিভুক্ত নেই। সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ জাতীয় মেডিক্যাল কমিশনের আইন মোতাবেক। দক্ষিণ ভারতের অনেক হাসপাতাল এখানে হাসপাতাল করছে অথবা এখানকার হাসপাতাল কিনে নিচ্ছে। উদাহরণ, মণিপাল গোষ্ঠী। আদানী গোষ্ঠী রাজারহাটে ২০০০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করতে চলেছে। বিপি পোদ্দার গোষ্ঠীও মোট ২২০০ কোটি টাকা লগ্নি করে রাজারহাট, হাওড়া, দুর্গাপুর ও শিলিগুড়িতে হাসপাতাল বানাতে পরিকল্পনা নিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ডাক্তার ছাড়া দক্ষিণী ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, শিক্ষক বা অন্যান্য পেশাদারদের কদর পশ্চিমবঙ্গে তেমন নেই।
প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাঙালির থেকে অবাঙালি ডাক্তার পেলে বেশিমাত্রায় নিয়োগ করছে শুধু বাঙালি রোগীদের আস্থা অর্জনের কারণে। ডাক্তারের পদবি, দক্ষিণ ভারতীয় হলে তো কথাই নেই— যেখানে পরিষেবার চেয়ে ব্যবসাই অগ্রগণ্য। এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিজেদের তৈরি চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস। শুধু ডাক্তার বা হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়— প্রতি রোগীর জন্য কত সময়, কতজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স, কত দ্রুত পরীক্ষা, ওষুধের ধারাবাহিকতা, রেফারাল সিস্টেম এবং হাসপাতাল পরিচালনা ও তদারকি কতটা কার্যকর— এগুলোই রাজনৈতিক পালাবদলের নিরিখে আসল পার্থক্য তৈরি করে।




