নেপালে ভোটেকোশী নদীর আকস্মিক বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। বুধবার সকালে চিন সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় পাহাড়ি নদীর হঠাৎ ফুলে ওঠা জলের স্রোত গ্রাম, রাস্তা, সেতু এবং মানুষের জীবনকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। চারশোরও বেশি মানুষ নিখোঁজ বা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নিখোঁজদের মধ্যে ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিক। উদ্ধারকাজ যত এগোবে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে— এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই মুহূর্তে সংখ্যাগুলির দিকে তাকিয়ে বিপর্যয়ের মাত্রা বোঝা সম্ভব, কিন্তু মানুষের কষ্টের গভীরতা বোঝা যায় না। একটি পরিবারে হঠাৎ কেউ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, প্রিয়জনের ফিরে আসার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎকণ্ঠায় থাকা, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনকে খুঁজে বেড়ানো— এই যন্ত্রণা কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তাই এই বিপর্যয়ের প্রথম এবং প্রধান প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষের জীবন রক্ষা করা।
বন্যাটি এত আকস্মিক ছিল যে, মানুষ প্রস্তুতির সুযোগই পায়নি। প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে পাহাড়ে পাথর ও বরফের ধস থেকে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। সেই ধসের ফলে লহেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ পলি ও ধ্বংসাবশেষসহ জল নেমে আসে এবং পরে তা ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবাহিত হয়। আবার ভূমিকম্প, বরফধস কিংবা তিব্বতে নদী আটকে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও প্রথম দিকে বলা হয়েছিল। অর্থাৎ বন্যার সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি এখন জরুরি হল— এই ধরনের বিপর্যয় ভবিষ্যতে কীভাবে ঠেকানো যায়, তার উত্তর খোঁজা।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয়, এই নদী শুধু নেপালের নয়। তিব্বত থেকে নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি পরে ভারতে গণ্ডক নামে প্রবেশ করে। ফলে সীমান্তের এক প্রান্তে ঘটে যাওয়া এমন বিপর্যয় অন্য দেশকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নেপাল, চিন ও ভারতের মধ্যে আরও কার্যকর নদী-তথ্য বিনিময়, আগাম সতর্কবার্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সমন্বয় কতখানি প্রয়োজনীয়।
ভারতের প্রতিক্রিয়া এই মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে সব ধরনের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতীয় বায়ুসেনা ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে বিমান পাঠিয়েছে, আরও বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধান এবং তাঁদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তবে এই সহায়তার পরিধি শুধু ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বিপর্যয়ের সময় জাতীয়তার পরিচয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়, কিন্তু মানুষের জীবন তার চেয়েও বড়।
নেপাল আজ যে বিপদের মুখোমুখি, তা থেকে ভারতেরও শেখার আছে। হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, বরফ গলা, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি নদীর চরিত্রের পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণের সময় তাই শুধু উন্নয়নের হিসাব নয়, প্রকৃতির শক্তি এবং দুর্যোগের সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এই মুহূর্তে উদ্ধারকর্মীদের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হল ধ্বংসস্তূপ ও বিচ্ছিন্ন এলাকায় পৌঁছনো, আহতদের চিকিৎসা দেওয়া এবং নিখোঁজদের খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাবার, আশ্রয়, পানীয় জল এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশাসনিক তৎপরতা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে জাতি, ধর্ম, ভাষা বা সীমান্তের বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিয়ে আসে। নেপালের এই বিপর্যয় আবার সেই সত্যটি মনে করিয়ে দিল। আজ নেপালের মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু একটি প্রতিবেশী দেশের পাশে দাঁড়ানো নয়— তা মানবতার পাশে দাঁড়ানো। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর পুনর্গঠন শুরু হবে, কিন্তু তারও আগে প্রয়োজন প্রতিটি নিখোঁজ
মানুষকে খুঁজে পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা। কারণ এই মুহূর্তে প্রতিটি জীবনই
সমান মূল্যবান।




