• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 26 August, 2026

জলের তোড়ে ভেসে গেল বন্ধুত্বের সাঁকো, সময় থাকতেও কি চিন সতর্ক করল না নেপালকে? জমাট রহস্য

তিব্বত থেকে নেমে আসা হড়পা বানে বিধ্বস্ত নেপাল, দুই ঘণ্টার বেশি দেরিতে সতর্কবার্তা দেওয়ার অভিযোগ চিনের বিরুদ্ধে। ১০৫ ভারতীয় নিখোঁজ, প্রভাব পড়তে পারে উত্তরবঙ্গেও।

জলের তোড়ে ভেসে গেল বন্ধুত্বের সাঁকো, সময় থাকতেও কি চিন সতর্ক করল না নেপালকে? জমাট রহস্য

Floodwaters in front of the main Chinese border facility at Rasuwaghadi, where the bridge leading toward the central border gate has been completely washed away. (Source: Radio Rasuwa)

সকাল তখন পৌনে ন’টা। রাসুওয়া আর ধাডিং জেলার মানুষ রোজকার মতোই ব্যস্ত। হঠাৎই তিব্বতের দিক থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে এল জলের পাহাড়। ভোটে কোশী (Bhote Koshi) নদীর দুই পাড় ভাসিয়ে দিল উন্মাদ জলরাশি, ভেঙে দিল বাড়িঘর, উড়িয়ে দিল সেতু। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু এখন মৃতের সংখ্যা আর নিখোঁজের তালিকা গুনছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে যে প্রশ্নটা এখন সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠছে, তা হল, চিন (China) কি জেনেশুনেই নেপালকে সময়মতো সতর্ক করেনি।

২ ঘণ্টার রহস্য

নেপালি সংবাদমাধ্যম উকেরার একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিব্বতের কেরুং কাউন্টিতে (Kerung County) এই হড়পা বান আছড়ে পড়ে চিনা সময় সকাল সাড়ে দশটায়। চিন আর নেপালের মধ্যে সময়ের ফারাক দুই ঘণ্টা পনেরো মিনিট। সেই হিসেবে নেপালি সময়ে তখন সকাল সওয়া আটটা। অথচ নেপাল প্রশাসনের কাছে এই খবর পৌঁছয় আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর, তাও চিনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নয়। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) মুখপাত্র শান্তি মহতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাসুওয়ার জেলাশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার তাঁকে ফোন করে জানান যে স্থানীয় বাসিন্দারা কেরুং থেকে নেপালের দিকে ধেয়ে আসা জলের স্রোত দেখতে পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রশাসনিক সতর্কতা নয়, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষই রিলে করে করে পৌঁছে দিয়েছিল প্রথম সতর্কবার্তা।

চিনা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক ভাবে নেপালকে বিপর্যয়ের কথা জানায় দুপুর একটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ। ততক্ষণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গিয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গিয়েছে, মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন, অনেকে জলের তোড়ের সঙ্গে দৌড়ে পারছেন না।

একই অভিযোগ

এই প্রথম নয়। গত বছরও একই নদীতে হড়পা বানের সময় চিনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ উঠেছিল। পরে জানা যায়, তিব্বতে একটি হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়ার কারণেই সেই বিপর্যয় ঘটেছিল। এ বছরের বিপর্যয়ের কারণ নিয়েও একাধিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। কাঠমান্ডু-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্রের (ICIMOD) দাবি, উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে ল্যাংটাং হিমাল রেঞ্জের উত্তরে একটি হিমবাহের উপরে থাকা হ্রদ (supraglacial lake) থেকে জল উপচে পড়েই এই বিপর্যয় ঘটেছে। আবার নেপালের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, ভূমিকম্পের জেরে তুষারধস নেমে এই হড়পা বান তৈরি হয়েছে। চিনা সংবাদমাধ্যম জিনহুয়ার (Xinhua) দাবি, শিগাৎসে অঞ্চলের কেরুং বন্দরের কাছে ভয়াবহ ধসের জেরেই এই বিপর্যয়। কারণ যাই হোক, হিমালয় জুড়ে চিনের লাগামছাড়া নির্মাণকাজও বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে অভিযোগ উঠেছে।

মৃত্যু, নিখোঁজ আর ধ্বংসস্তূপ

এখনও পর্যন্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা কয়েক ডজন ছুঁয়েছে, নিখোঁজের তালিকায় নাম প্রায় চারশো জনের, যার মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক বলেও প্রাথমিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, শুল্ক দপ্তর থেকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সব ভেসে গিয়েছে। নেপালের জ্বালানি মন্ত্রক জানিয়েছে, দেশের মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় বারো শতাংশ, অর্থাৎ ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ এই বিপর্যয়ে ব্যাহত হয়েছে। নেপাল আর চিনের মধ্যে সংযোগকারী বিখ্যাত ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজও (Friendship Bridge) ভেসে গিয়েছে জলের তোড়ে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ পুলিশ ও সেনাকে উদ্ধারকাজে নামিয়েছেন, নদীর ধারের বাসিন্দাদের উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ওদিকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping) সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযানের নির্দেশ দিয়ে ভবিষ্যতে শক্তিশালী পূর্বাভাস ব্যবস্থা তৈরির কথা বলেছেন, যদিও নিজের দেশের বিলম্বিত সতর্কবার্তা নিয়ে চিন এখনও প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

পশ্চিমবঙ্গের নিরিখেও জরুরি

ভোটে কোশী গিয়ে মিশেছে ত্রিশূলী নদীতে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতে ঢুকে গণ্ডক নদী নামে বিহার হয়ে বাংলার দিকে প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ তিব্বতের এই বিপর্যয়ের ঢেউ শুধু নেপালেই থেমে থাকছে না, সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বিহার ও উত্তরপ্রদেশেও সতর্কতা জারি হয়েছে। এই ঘটনা উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের কাছেও একটি সতর্কবার্তা। তিস্তা নদীও তিব্বত থেকেই উৎপন্ন, আর ২০২৩ সালে সিকিমে হিমবাহ হ্রদ ফেটে যে বিপর্যয় হয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও টাটকা। চিন যদি সীমান্ত পেরিয়ে সময়মতো তথ্য না জানায়, তা হলে দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের নদী উপত্যকার নিরাপত্তার প্রশ্নও নতুন করে সামনে আসছে। উল্লেখ্য, ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ইতিমধ্যে হেল্পলাইন নম্বর প্রকাশ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।