• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 15 August, 2026

সুভাষচন্দ্র :কোচবিহার ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বিতর্ক

স্বাধীনতার আট দশক পরেও তাঁকে ঘিরে কোনও বিতর্ক যখন রাজপথে মানুষের আবেগকে আলোড়িত করে, তখন আসলে সেই বিতর্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন—কেন সুভাষ আজও এত গভীরভাবে বাঙালি তথা ভারতীয় জনমানসে জীবিত?

সুভাষচন্দ্র :কোচবিহার ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বিতর্ক

Image: SNS

ইতিহাসের কিছু চরিত্র কেবল ইতিহাসের পাতায় থাকেন না। তাঁরা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে জনস্মৃতির অংশ হয়ে ওঠেন। সুভাষচন্দ্র বসু (Subhash Chandra Bose)  তাঁদেরই একজন। স্বাধীনতার আট দশক পরেও তাঁকে ঘিরে কোনও বিতর্ক যখন রাজপথে মানুষের আবেগকে আলোড়িত করে, তখন আসলে সেই বিতর্কের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন—কেন সুভাষ আজও এত গভীরভাবে বাঙালি তথা ভারতীয় জনমানসে জীবিত?

সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই প্রশ্নটিরই নতুন করে উত্তর দিয়েছে। রাজনৈতিক দল, সংগঠন কিংবা মতাদর্শের নিজস্ব কর্মসূচির বাইরে সাধারণ মানুষের যে আবেগ ও প্রতিবাদের প্রকাশ দেখা যায়, তার মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—সুভাষচন্দ্র (Subhash Chandra Bose) কোনও একটি দলের সম্পত্তি নন। তাঁকে কোনও রাজনৈতিক ছাঁচে সম্পূর্ণ বন্দি করা যায় না। তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রতি মানুষের আবেগ তার চেয়ে অনেক পুরোনো এবং অনেক গভীর।

এই কারণেই সরকারি স্বীকৃতি বা অবহেলা, রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান কিংবা সময় বিশেষের রাজনৈতিক সুবিধা—কোনও কিছুই সুভাষচন্দ্রের (Subhash Chandra Bose) জন নেতৃত্বকে মুছে দিতে পারেনি। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নেতা খুব বেশি নেই, যাঁদের মৃত্যুর বহু দশক পরেও তাঁদের নাম উচ্চারণমাত্র মানুষের মধ্যে এমন স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক বিতর্কের আর একটি অদ্ভুত দিকও রয়েছে। বিতর্কিত মন্তব্য কখনও কখনও এমন কিছু প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে, যেগুলি দীর্ঘদিন জনআলোচনার বাইরে ছিল। কোচবিহারের ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস এবং নেতাজির (Subhash Chandra Bose) সহযোদ্ধা দেবনাথ দাসের ভূমিকা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।কোচবিহারের ভারতের সঙ্গে সংযুক্তি কোনও একদিনের ঘটনা ছিল না।

দেশভাগ ও স্বাধীনতার পর দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর প্রক্রিয়ার মধ্যেই কোচবিহারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। ২৮ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখে মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ এবং ভারতের গভর্নর-জেনারেলের মধ্যে Merger Agreement স্বাক্ষরিত হয়; ১২ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার কোচবিহারের প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নথিতে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার শেষ ফলটি দেখা যায়, তার পিছনে জনমত, সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের ভূমিকা ছিল কি না—এই প্রশ্নটিও ইতিহাসের গবেষণার দাবি রাখে। এই প্রসঙ্গে উঠে আসে দেবনাথ দাসের নাম।

দেবনাথ দাস ছিলেন আজাদ হিন্দ সরকারের সঙ্গে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের কর্মী। নেতাজির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিমণ্ডলের এই মানুষটির পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোচবিহারের ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। পরবর্তী কালে নেতাজির (Subhash Chandra Bose) অন্তর্ধান-রহস্য নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন; এমনকি কুখ্যাত বিমানদুর্ঘটনার পর নেতাজির (Subhash Chandra Bose) সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে তাঁর বক্তব্য কেবল প্রচলিত বয়ানকে অনুসরণ করেনি। কৌশলগতভাবে চিন ও রাশিয়ার দিকে নেতাজির (Subhash Chandra Bose) সম্ভাব্য যাত্রাপথ নিয়ে তাঁর বক্তব্য পরবর্তী অনুসন্ধানেও আলোচিত হয়েছে।

তাই কোচবিহারের অন্তর্ভুক্তির ইতিহাসে দেবনাথ দাসের ভূমিকার দাবি যদি তোলা হয়, সেটিকে নিছক রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনই পর্যাপ্ত প্রাথমিক নথি ছাড়া তাঁকেই ‘প্রধান নেতা’ বলে চূড়ান্ত ইতিহাস লিখে ফেলাও সমান অনৈতিহাসিক। প্রয়োজন সংবাদপত্রের সমকালীন প্রতিবেদন, সরকারি নথি, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের দলিল পাশাপাশি রেখে গবেষণা করা।

Debnath Das
Debnath Das

অর্থাৎ প্রশ্নটি হওয়া উচিত—নথি কোথায়?

কে কী বললেন, তা দিয়ে ইতিহাসের শেষ কথা নির্ধারিত হয় না। ইতিহাসের বিচার হয় দলিল দিয়ে।কোচবিহারের ক্ষেত্রে আরও একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। ২৮ আগস্ট ছিল Merger Agreement স্বাক্ষরের তারিখ; ১২ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব গ্রহণ করে; আর ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে একীভূত হয়।

এই তিনটি পর্যায়কে এক করে দেখলে ইতিহাসের সূক্ষ্মতা হারিয়ে যায়।

কিন্তু সেই সূক্ষ্মতার মধ্যেই দেবনাথ দাসের মতো নেতাজি-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্ভাব্য ভূমিকা অনুসন্ধান করার সুযোগ রয়েছে। সমকালীন সংবাদপত্রে তাঁর উপস্থিতির উল্লেখ থাকলে তা অবশ্যই মূল্যবান প্রাথমিক সূত্র—তবে সেই সংবাদকে আরও সরকারি নথি ও অন্যান্য স্বাধীন সূত্র দিয়ে যাচাই করাই হবে ইতিহাসচর্চার সঠিক পদ্ধতি। এখানেই রাজনৈতিক প্রচার ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য। এবার আসা যাক আরও বিস্ফোরক প্রশ্নে।

সুভাষচন্দ্র বসু কি ‘War Criminal’ বা যুদ্ধাপরাধী ছিলেন?

এই প্রশ্নের সঙ্গে একটি বহুল প্রচারিত তথাকথিত নেহরু-অ্যাটলি চিঠির কাহিনি জড়িয়ে আছে। ১৯৪৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখযুক্ত একটি চিঠি বহু বছর ধরে প্রচারিত হয়েছে, যেখানে নেহরুর নামে সুভাষচন্দ্রকে ‘your war criminal’ বলা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে যে স্ট্যালিন তাঁকে সোভিয়েত ভূখণ্ডে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সতর্কতা প্রয়োজন

চিঠিটির প্রচলিত প্রতিলিপিতে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে—‘Clement Attlee’-এর নামের ভুল, ‘Jawaharlal’-এর বানান, ‘10 Down Street’ ইত্যাদি। চিঠিটির মূল সরকারি নথি হিসেবে প্রামাণিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন fact-check এবং সংবাদ-অনুসন্ধানে এটিকে প্রমাণিত নেহরু-চিঠি হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।

কিন্তু এখানেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না

কারণ, চিঠিটির প্রচলিত কাগজটি এবং শ্যামলাল জৈনের সাক্ষ্য—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্য নিয়ে গঠিত খোসলা কমিশনের সামনে শ্যামলাল জৈন তাঁর স্মৃতি থেকে নেহরুর নির্দেশে একটি চিঠি টাইপ করার কথা বলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ পরবর্তী দশকগুলিতে প্রবল বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই সাক্ষ্য এবং তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে অধ্যাপক সমর গুহ বিশেষভাবে অনুসন্ধান করেছিলেন।

১৯৭৮ সালে এস. চাঁদ অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত সমর গুহর Netaji, Dead or Alive? বইটি এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। গ্রন্থটির প্রকাশ-তথ্য স্বাধীন গ্রন্থাগারিক ও বইয়ের ক্যাটালগেও নিশ্চিত করা যায়। অতএব, যুক্তিসঙ্গত অবস্থানটি হওয়া উচিত না—‘চিঠিটি নিশ্চিতভাবে সত্য’, আবার না—‘চিঠির সঙ্গে সম্পর্কিত সব সাক্ষ্যই জাল’। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত:

মূল নথি কোথায়?
সাক্ষ্যের পূর্ণ প্রতিলিপি কী বলে?
সমসাময়িক সরকারি ফাইল কী বলে?
পরবর্তী তদন্তে কোন দলিল গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে?

ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই হবে।আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—ধরা যাক, কোনও রাজনৈতিক বা সরকারি নথিতে সুভাষচন্দ্রকে ‘war criminal’ বলা হয়েছিল। তাতেই কি ইতিহাসের বিচারে তিনি যুদ্ধাপরাধী হয়ে যান? অবশ্যই নয়।

‘War criminal’ একটি আইনি-ঐতিহাসিক অভিধা। কোনও ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধী বলার জন্য নির্দিষ্ট অপরাধ, তার প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট আইন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রশ্ন আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সরকার সুভাষচন্দ্র ও আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছিল, তার রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল প্রবল। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অভিধা এবং স্বাধীন ভারতের ইতিহাসচর্চায় কোনও ব্যক্তির চূড়ান্ত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন—এই দুটি এক বিষয় নয়।

আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের অবস্থানকে সরলীকরণ করলে নেতাজির (Subhash Chandra Bose) রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রকৃতি বোঝা যায় না। একইভাবে, নেতাজি জাপানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলেই তাঁকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে অভিহিত করা ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে এক শব্দে মুছে ফেলার নামান্তর।

সুভাষচন্দ্রের (Subhash Chandra Bose) রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। তাঁর সামরিক কৌশল নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। অক্ষশক্তির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে কঠিন প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দটি ব্যবহার করলে তার পক্ষে ঐতিহাসিক ও আইনগত প্রমাণও দেখাতে হবে।সুভাষচন্দ্রের (Subhash Chandra Bose) অন্তর্ধান নিয়ে ভারত সরকার একাধিক তদন্ত করেছে। শাহনওয়াজ কমিটি বিমানদুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল; পরে ১৯৭০ সালে গঠিত খোসলা কমিশনও একই মূল সিদ্ধান্তে পৌঁছয়। পরবর্তী সময়ে মুখার্জি কমিশনও বিষয়টি পুনরায় পরীক্ষা করে। সরকারি নথিতেই এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানের ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে।

অর্থাৎ ‘নেতাজি মারা গিয়েছিলেন কি না’—এই প্রশ্নটি কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের বহু দশকের অনুসন্ধানের বিষয়।

আর এই কারণেই সমর গুহর মতো সাংসদদের ভূমিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন, নথি প্রকাশের দাবি করেছিলেন এবং পুনরায় তদন্তের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। সমর গুহর Netaji, Dead or Alive? সেই দীর্ঘ বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশিত দলিল। আজকের দিনে নেতাজিকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদ সম্ভবত তাঁকে নিয়ে অতিরিক্ত রাজনীতি করা নয়; তাঁকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করে তাঁর প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে দেওয়া।

এক পক্ষ তাঁকে নিজেদের মতাদর্শের পূর্বপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্য পক্ষ তাঁকে অন্য কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কেউ তাঁর উত্তরাধিকারকে আঞ্চলিক পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে ফেলতে চায়। আবার কেউ তাঁর নাম ব্যবহার করে পুরনো রাজনৈতিক বিরোধ পুনরুজ্জীবিত করতে চায়।

কিন্তু সুভাষচন্দ্র এই সমস্ত সংকীর্ণতার চেয়ে বড়।

তাঁকে বুঝতে হলে পড়তে হবে তাঁর নিজের লেখা, আজাদ হিন্দ সরকারের নথি, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগের দলিল, ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথি, সমকালীন সংবাদপত্র, তাঁর সহযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা এবং পরবর্তী তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট। কোচবিহারের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি প্রযোজ্য। কোনও রাজনৈতিক নেতা কী বললেন, সেটি ইতিহাসের বিকল্প হতে পারে না।

বরং ইতিহাসের কাছে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও জবাবদিহি থাকা উচিত।

সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘিরে আজও যে আবেগ জেগে ওঠে, তার কারণ তিনি কেবল অতীতের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নন। তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অসম্পূর্ণ স্বপ্নের নাম। তিনি এমন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক, যার পরিণতি ইতিহাসে ঘটেনি—কিন্তু যার আকর্ষণ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে টেনে নিয়ে চলেছে। তাই তাঁকে নিয়ে বিতর্ক থামবে না। বরং বিতর্ক আরও বাড়বে। নতুন নথি বেরোবে, পুরনো দলিল পুনরায় পড়া হবে, প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা প্রশ্নের মুখে পড়বে।কিন্তু সেই বিতর্কের ভাষা যেন কুৎসার না হয়, দলীয় আনুগত্যের না হয়, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের না হয়।ইতিহাসের ভাষা হোক দলিলের।

কোচবিহারের ভারতভুক্তিতে দেবনাথ দাসের ভূমিকা যদি থাকে—দলিল তা প্রতিষ্ঠা করুক। যদি না থাকে—দলিলই তা খণ্ডন করুক। নেহরুর নামে প্রচারিত চিঠি সত্য হলে তার মূল নথি সামনে আসুক; মিথ্যা হলে তার উৎস ও নির্মাণপ্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হোক। ‘যুদ্ধাপরাধী’ অভিধা যদি কেউ ব্যবহার করেন, তবে তার ঐতিহাসিক ও আইনগত ভিত্তি দেখান।

কারণ সুভাষচন্দ্রের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে বসানো নয়

প্রকৃত শ্রদ্ধা হল—তাঁকে নিয়ে যত বড় প্রশ্নই উঠুক, সত্যকে সামনে আনার সাহস রাখা। রাজনীতির আকাশে বহু নক্ষত্রের উদয় ও অস্ত হয়েছে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের উপস্থিতি যেন অন্যরকম। তিনি ফিরে আসেন—প্রতিবার কোনও না কোনও বিতর্কের মধ্য দিয়ে, কোনও না কোনও প্রশ্নের ভিতর দিয়ে, কোনও না কোনও প্রজন্মের কণ্ঠে। সম্ভবত সেই কারণেই তিনি এখনও ধ্রুবতারা।রাজনীতির তীর্থক্ষেত্রে সময়ের চক্র যতবারই ঘুরে আসুক, সুভাষচন্দ্রের নাম ততবারই নতুন করে উচ্চারিত হবে। কারণ কিছু নেতা ইতিহাসে থাকেন।আর কিছু নেতা—মানুষের হৃদয়ে।