বাদল অধিবেশন শেষ হল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই। শেষটাও হল এমন এক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে, যা এখন সংসদীয় রাজনীতিতে প্রায় নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ গণতন্ত্রে অস্বাভাবিক নয়। বরং সংসদে সেই মতপার্থক্যেরই প্রকাশ ঘটার কথা। কিন্তু মতবিরোধ যখন আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয় এবং সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করে, তখন প্রশ্ন ওঠে— এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যটাই কি কোথাও পেছনে চলে যাচ্ছে?
এই অধিবেশনে বেশ কিছু বিল পাশ হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থবহ আলোচনা হয়নি। বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলন, নিয়োগ পরীক্ষা এবং প্রতিবাদকারীদের উপর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছিল, সেগুলি নিয়ে সংসদে যথেষ্ট সময় ধরে আলোচনা হওয়া দরকার ছিল। দেশের বহু ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীর উদ্বেগের সঙ্গে এই বিষয়গুলি জড়িয়ে রয়েছে। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনই সেই প্রশ্নগুলিকে সংসদীয় পরিসরে দায়িত্বশীল ভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব বিরোধীদেরও।
এই জায়গাতেই সরকার ও বিরোধী— দুই পক্ষেরই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে। সরকার যদি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বার্থের বিষয়ে আলোচনার দাবি এড়িয়ে যায়, তা হলে বিরোধীদের অসন্তোষ বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। আবার বিরোধী দল যদি আলোচনার বদলে লাগাতার হট্টগোল ও কর্মসূচি বেছে নেয়, তাতেও সংসদের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি যেমন সরকারের হাতে, তেমনই বিরোধীদের হাতে রয়েছে প্রশ্ন তোলা, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং বিকল্প মত তুলে ধরার সাংবিধানিক দায়িত্ব। দু’পক্ষের এই ভূমিকা পরস্পরের পরিপূরক।
সংসদ চালানো দেশের অর্থ ও সময়— দুইয়েরই ব্যবহার। প্রতিটি অধিবেশন সাধারণ মানুষের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই সংসদের মূল্য শুধু কতগুলি বিল পাশ হল, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না। কতটা আলোচনা হল, কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য জানা গেল, বিরোধীরা কতটা নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলেন— এসবও সংসদের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। সংসদ অচল হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষই।
এই অধিবেশনের আর একটি ঘটনা আমাদের সামাজিক বাস্তবতার অস্বস্তিকর দিকটি সামনে এনেছে। রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গে উত্তরাখণ্ডে একটি অনুষ্ঠানে যে মঞ্চে বক্তব্য রেখেছিলেন, পরে সেই মঞ্চ ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে পরিষ্কার করার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এমন ঘটনায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া জরুরি যে, জাতপাতের নামে কোনও ধরনের বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। শাসক দলের পক্ষ থেকেও ঘটনার নিন্দা এবং তদন্তের আশ্বাস এসেছে। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন। আধুনিক ভারতের সঙ্গে এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ একেবারেই বেমানান।
অধিবেশনের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা-সহ বিভিন্ন দলের নেতারা একসঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’-এর সময় উপস্থিত ছিলেন। দৃশ্যটি মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক, জাতীয় স্বার্থের কিছু মৌলিক জায়গায় সকলেরই একটি অভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে। সংসদ সেই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী— কেউই একে অপরের বিকল্প নয়; দু’পক্ষ মিলেই সংসদীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর করে। সরকারকে বিরোধীদের বক্তব্য শোনার এবং প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য যথেষ্ট পরিসর দিতে হবে। বিরোধীদেরও বুঝতে হবে, সংসদ অচল করে দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থ রক্ষা করা যায় না। প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন গণতন্ত্রের অঙ্গ, তেমনই আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সংস্কৃতিও গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।
তাই আগামী অধিবেশনে প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি থেকে কিছুটা সরে এসে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। বিতর্ক হোক, তীব্র সমালোচনা হোক, সরকারের জবাবদিহি হোক, কিন্তু সংসদ চলুক। কারণ সংসদ কেবল সরকার ও বিরোধীদের রাজনৈতিক শক্তিপরীক্ষার জায়গা নয়, এটি দেশের মানুষের আশা, অভিযোগ ও প্রশ্নের সাংবিধানিক মঞ্চ। সেই মঞ্চকে সচল রাখা সরকার ও বিরোধী— উভয়েরই সমান দায়িত্ব।




