ভারতের দ্রুততম মানুষ কে? গুরিন্দরবীর সিং, না অনিমেষ কুজুর? দেশের অ্যাথলেটিক্স মহলে এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। কিন্তু সেই বিতর্কে একেবারেই আগ্রহী নন অনিমেষ। ২০০ মিটারে জাতীয় রেকর্ডধারীর লক্ষ্য এখন অন্যত্র— কমনওয়েলথ গেমস এবং এশিয়ান গেমসে পদক জিতে জবাব দেওয়া।
এ বছরের শুরুতে গুরিন্দরবীর সিং ১০০ মিটারে ১০.১০ সেকেন্ডের জাতীয় রেকর্ড গড়ার পর থেকেই অনিমেষকে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে, তিনি কবে আবার ‘ভারতের দ্রুততম মানুষ’-এর তকমা ফিরে পাবেন। কিন্তু ওড়িশার এই স্প্রিন্টার এখনই সেই আলোচনায় যেতে রাজি নন।
এই প্রশ্নের উত্তরে অনিমেষের সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘আমি এখন শুধু এশিয়ান গেমসের জন্য অপেক্ষা করছি।” ফের প্রশ্ন করলে হেসে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, এশিয়ান গেমস পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর আবার এ নিয়ে কথা হবে’।
ব্রিটিশ কোচ মার্টিন ওয়েন্সের অধীনে গত কয়েক বছরে দ্রুত উন্নতি করেছেন ২২ বছরের এই স্প্রিন্টার। রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রকল্পে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিয়েছিলেন, তাও জানালেন অনিমেষ।
তিনি বলেন, ‘আমি রিলায়েন্স এবং সেখানে থাকা অ্যাথলিটদের সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করি। অম্লান বরগোহাঁই এবং জ্যোতি ইয়ারাজির পারফরম্যান্স দেখেছিলাম। আমার কোচ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রেস দেখার পর আমি রিলায়েন্সে যোগ দিতে চাই কি না। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। সেই দিন থেকেই আমরা একসঙ্গে কাজ করছি’।
অবশ্য কোচ মার্টিন ওয়েন্সের বক্তব্যে ছিল রসিকতার ছোঁয়া। তিনি হেসে বলেন, ‘আসল ঘটনা হল, ও আমার কাছে এসে বারবার অনুরোধ করছিল যেন আমি ওকে কোচিং করাই। তবে ও বোধহয় ভুল করে অন্য কাউকে ভেবেছিল’!
তার পরই গম্ভীর হয়ে বলতে শুরু করেন, ‘ও যখন প্রথম আসে, তখন ২১.১ সেকেন্ডে দৌড়াত। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল ওর মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে, শুধু একটু ঘষেমেজে তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে আমরা একটু একটু করে উন্নতি করার চেষ্টা করছি। ও খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আর সেটাই ওর সবচেয়ে বড় শক্তি’।
গুরিন্দরবীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে কোনও নেতিবাচক মনোভাব নেই বলেও জানিয়ে দিয়েছেন ওয়েন্স। তাঁর কথায়, ‘গুরি এত দ্রুত দৌড়চ্ছে, এতে আমরা সত্যিই খুশি। মানসিকভাবে এটা ভারতীয় স্প্রিন্টিংকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। গুরি এবং ওর কোচিং দলকে অভিনন্দন। আমরা সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাই, ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতা নয়। ও ভালো দৌড়লে আমাদেরও ভালো লাগে’।
ভারতীয় স্প্রিন্টিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী এই ব্রিটিশ কোচ। তিনি বলেন, ‘চার বছর আগে সবাই বলত, ১০ সেকেন্ডের বাধা ভাঙা অসম্ভব। এখন প্রশ্নটা আর ‘হবে কি না’ নয়, বরং ‘কবে হবে’। গুরিন্দরবীর, মানিকান্ত এবং প্রণব— সবাই মান আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের হাতে দারুণ এক ঝাঁক তরুণ স্প্রিন্টার রয়েছে। ওদের বিশ্বাস, ওরাই প্রথম ১০ সেকেন্ড কিংবা ২০ সেকেন্ডের বাধা ভাঙবে। ভারত অবশ্যই সেখানে পৌঁছবে। তারপর ৯.৮, ৯.৭… এভাবেই এগোবে। যদি ভারতের নিজস্ব উসেইন বোল্টকে খুঁজে পাই, তাহলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না’।
বিদেশে প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা যে তাঁর উন্নতিতে বড় ভূমিকা নিয়েছে, তাও জানিয়েছেন অনিমেষ। তিনি বলেন, ‘আমার থেকে দ্রুত দৌড়বিদদের সঙ্গে ট্র্যাকে নামলে বুঝতে পারি, ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। ভারতে বিশেষ করে ২০০ মিটারে শুরু থেকেই আমি এগিয়ে থাকি। তাই ইউরোপের রেসে নামা খুব জরুরি। সেখানে টেকনিকে কোথায় উন্নতি করতে হবে, সেটা বুঝতে পারি এবং অনুশীলনে সেই অনুযায়ীই কাজ করি’।
বড় স্টেডিয়াম বা দর্শকের চিৎকারেও চাপে পড়েন না তিনি। অনিমেষের কথায়, ‘অনেকে মনে করেন, বড় দর্শকাসনের সামনে অ্যাথলিটরা ভয় পায়। কিন্তু আমার ঠিক উল্টো অনুভূতি হয়। আমি বরং রোমাঞ্চিত হই। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও কোনও চাপ অনুভব করিনি। বরং বিশ্বের সেরাদের বিরুদ্ধে নিজের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ হিসেবে দেখেছি’।
কমনওয়েলথ ও এশিয়ান গেমসের আগে বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা নিয়েও আশাবাদী তিনি। বলেন, ‘এ বছর একাই জার্মানিতে গিয়েছিলাম, একাই প্রতিযোগিতায় নেমেছি এবং সেখানেই ব্যক্তিগত সেরাও করেছি। প্রতিটি সফর আমাকে নতুন কিছু শেখায়— কীভাবে ভ্রমণ করতে হয়, কীভাবে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়, চাপ কীভাবে সামলাতে হয়। সেই সব শিক্ষাই কমনওয়েলথ গেমস এবং এশিয়ান গেমসে কাজে লাগাতে চাই’।
নিজের প্রিয় ইভেন্ট ২০০ মিটার নিয়েও আক্ষেপ রয়েছে অনিমেষের। বলেন, ‘এ বছর ২০০ মিটারে খুব বেশি প্রতিযোগিতা হয়নি। তাইওয়ানে মাত্র একটি সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু বৃষ্টির জন্য শুধু হিটেই দৌড়াতে হয়েছিল। আমি ২০০ মিটারে আরও উঁচু মানের প্রতিযোগিতা চাই এবং ১০০ মিটারের মতো এখানেও নিজেকে আরও উন্নত করতে চাই’।




