ছয় মাস ধরে লড়লেন, চেষ্টার এক ফোঁটাও কম ছিল না। শেষ পর্যন্ত ক্যানসারের কাছে হার মানলেন কেভিন কিগান। ৭৫ বছর বয়সে থেমে গেল এক অনন্য অধ্যায়। ইংল্যান্ডের ফুটবল হারালো তার অন্যতম সবচেয়ে রঙিন চরিত্রটাকে, বর্ণময় অথচ মাটির মানুষ। সত্তর আর আশির দশকের মাঠে যার পায়ের ছোঁয়ায় বুঁদ হয়ে থাকত ফুটবল দুনিয়া।
কিগান এক খনি শ্রমিকের ছেলে। সাউথ ইয়র্কশায়ার থেকে উঠে আসা মানুষটা ছোটবেলায় স্থানীয় কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেছিলেন। সেখান থেকেই উঠে গিয়েছেন সোজা লিভারপুল, হামবুর্গ, নিউক্যাসলের স্টারডমে। অথচ জৌলুশের আড়ালে ছিলেন সহজ, প্রাণখোলা। আত্মজীবনীর সহ-লেখক বলেছিলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন কিগান। বাড়ি যেতে গেলে নিজে হাতে ওয়াইনের বোতল এগিয়ে দিতেন। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর লেখক মেসেজ করেছিলেন ‘এই অসুখ যদি কেউ হারাতে পারে, তুমি পারবে।’ কিন্তু শরীরে ছড়িয়ে গিয়েছিল বিষ। শেষ পর্যন্ত থেমে গেলেন কিগান। রেখে গেলেন হাজার ভক্ত আর অনেক শূন্যতা।
একমাত্র ইংরেজ ফুটবলার হিসেবে দু’বার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন—১৯৭৮ আর ১৯৭৯-এ। ট্রফিটা নিয়ে কোথাও এক ফোঁটা অহংকার খুঁজে পাওয়া যেত না। মেসি বা রোনাল্ডোর ঝকঝকে সোনার ট্রফির পাশে কিগানের ব্যালন ডি’অর ভারি অন্যরকম হলুদ-সবুজ আর বেশ পুরনোসাজ। কাঠের বেস আলগা, নেমপ্লেটে স্পষ্ট আঁচড়। নিজে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘দাম দেখে চমকে গেছিলাম। লোকটা বলল কীইবা, দশ পাউন্ড হবে বড়জোর! আমার মনে হয় না, ক্রিশ্চিয়ানো দরজা আটকাতেও এটা ব্যবহার করবে।’ এমন মজার মানুষ ছিলেন, মুখে যা মনে আসে বলেই দিতেন।
১৯৭৬-৭৭’তে খুব কাছে গিয়েও তৃতীয় ব্যালন ডি’অর মিস করেছিলেন। দুঃখ করেননি মোটেও। তাঁর কাছে সবার আগে দল, পরে নিজে। কিংবদন্তি বেস্ট আর ববি চার্লটনের সঙ্গে নিজের নাম দেখেতেই অবাক হয়ে যেতেন!
নিউক্যাসলের সঙ্গে ছিল নিখাদ প্রেম, খেলার মাঠে হোক বা ম্যানেজার হিসেবে। গোলের পর গোল প্রাণভরে উদযাপন করতেন গ্যালোগেট এন্ডে, আবার কোচ হয়ে টেনে তুলেছেন দলকে অন্ধকার থেকে। ম্যাগপাইদের কাছে তিনি আজও ‘ঈশ্বর’। গত মরশুমেও সেন্ট জেমস পার্কে ছিল ‘লং লিভ কিং কেভ দ্য মেসায়া’ ব্যানার। আত্মজীবনী প্রকাশের সময় রাত দেড়টা পর্যন্ত অটোগ্রাফ দিয়ে গেছেন কেউ একটা সেলফি চাইলে দিয়েছেন, কেউ ফোন দিলে মজা করে কথা বলেছেন, বিদায়বেলায় বুকে জড়িয়েছেন কারও কাউকে। ক্লান্তি কখনও ছুঁতে পারেনি। নিজেই বলতেন, ‘দশ সেকেন্ড দিলে মানুষ শুধু একটা সই পায়, একটু বেশি কথা বললে সারা জীবনের স্মৃতি নিয়ে ফিরে যায়।’
আর, সেই বিখ্যাত স্কাই স্পোর্টসের সাক্ষাৎকার, ফার্গুসনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘ওদের হারাতে পারলে আমি দারুণ খুশি হব।’ সবাই ঝামেলা লাগায়, এই মন্তব্যের পর নাকি নিউক্যাসল চাপ সামলাতে পারেনি, লিগটা হাতছাড়া হয়। বাস্তব বলছে, ওই সাক্ষাৎকারের আগেই ইউনাইটেড পয়েন্টে অনেক এগিয়ে ছিল।
লিভারপুল, হামবুর্গে খেলোয়াড় হিসেবে লিগ জয়, ম্যানেজার হয়ে ফুলহ্যাম আর ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে টেনে তুলেছেন প্রিমিয়ার লিগে। ইংল্যান্ড দলের কোচিং হয়তো সাফল্যে ভরা ছিল না, কিন্তু তাঁর আক্রমণাত্মক ফুটবল আজও ফ্যানেরা মনে রাখে।
স্কানথর্প ইউনাইটেডে শুরু—রাগবির মাঠে, গোলপোস্টের পরিমাপে অজস্র ভুল। সেখান থেকে বিশ্ব মঞ্চ পর্যন্ত আসা। নিজেকে নিয়ে ঠিকই বলেছিলেন—‘আমার মধ্যে ক্রুয়েফের মতো ভেসে থাকা, পেলের মতো নরমতা, মারাদোনার মতো চলন ছিল না, বেস্টও বলেছিল, আমি ওর বুটের ফিতা বাঁধার যোগ্য না। কিন্তু ওদেরও আমার মতো জেদ, সাহস, আর ফুটবল-বুদ্ধি ছিল না। আমি যেন এক নেড়ি কুকুর, লড়তে লড়তে একেবারে বিশ্বসেরা প্রতিযোগিতায় পৌঁছে গেছি।’
এভাবেই শেষ হলো সেই লড়াকু প্রাণের গল্প। রেখে গেলেন হাজারো স্মৃতি, সাহসের এক অদম্য ঝাঁঝ।




