একদিকে বালোচিস্তানে (Balochistan) বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের আগুন, অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় (Khyber Pakhtunkhwa) তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (Tehreek-e-Taliban Pakistan বা TTP) লাগাতার হামলা। এর সঙ্গেই যোগ হয়েছে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের (Pakistan-Occupied Kashmir বা PoK) রাজপথে গণবিক্ষোভ এবং আফগানিস্তান সীমান্তে সেনা সংঘর্ষ। একসঙ্গে চার দিক থেকে ধেয়ে আসা সংকটে রীতিমতো নাজেহাল প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদ?
ভয়াবহ ছবি
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান রীতিমতো চোখ কপালে তুলে দিচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ সূচক ২০২৬ (Global Terrorism Index 2026) অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ গিয়েছে ১১৩৯ জনের, যা ২০১৩ সালের পর সর্বোচ্চ। শুধু চলতি বছরের জুন মাসেই পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (Pakistan Institute for Conflict and Security Studies বা PICSS) হিসেব বলছে, ওই একটি মাসেই হয়েছে ১১৮টি হামলা, মৃত্যু হয়েছে ১১২ জনের, জখম আরও ১৪৮।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, সন্ত্রাসকে কোনও ভাবেই সমর্থন করা যায় না ঠিকই, কিন্তু আজকের এই জঙ্গি সংগঠনগুলির জন্মের পিছনে অনেকটাই পাকিস্তানের নীতিই দায়ী। তাঁদের অভিমত, বিভিন্ন সময়ে নিজেদের স্বার্থে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মদত দেওয়ার সেই পুরনো কৌশলই এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে দেশের অন্দরে।
বালুচিস্তান বড় মাথাব্যথা
পাকিস্তানের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে অস্থির প্রদেশ বালোচিস্তান। বালোচ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইসলামাবাদ তাঁদের প্রদেশকে অবহেলা করে, প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করে এবং স্থানীয় দাবিদাওয়াকে দমিয়ে রাখে। গুপ্তহত্যা এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগও নতুন নয়।
জুলাই মাসে বালোচিস্তানের জিয়ারত জেলার মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি থানায় হামলা চালায় টিটিপি জঙ্গিরা, যাতে প্রাণ হারান ৯ জন পুলিশকর্মী। অপহৃত আরও ১৮ জনকে পরে গুলি করে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। মাত্র দু’দিন পরেই লাসবেলা জেলায় সেনা কনভয়ে হামলা চালায় বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (Balochistan Liberation Army বা BLA)। কোয়েটার কাছেও পৃথক হামলায় প্রাণ হারান চার জন। মাত্র চার দিনের মধ্যে পাকিস্তানের প্রায় ৪০ জন নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, বালোচিস্তানে পাকিস্তানকে লড়তে হচ্ছে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন লক্ষ্যের সংগঠনের বিরুদ্ধে। বিএলএ চায় স্বাধীন বালোচিস্তান, বালোচ জাতীয়তাবাদই তাদের ভিত্তি। অন্য দিকে টিটিপির লক্ষ্য গোটা পাকিস্তান জুড়ে নিজেদের ব্যাখ্যায় ইসলামি শাসন কায়েম করা। চলতি বছরে দশটিরও বেশি শহরে একযোগে হামলা চালিয়ে বিএলএ প্রমাণ করেছে, তাদের পরিকল্পনা ক্রমশ আরও পরিণত হয়ে উঠছে।
টিটিপি হামলা
উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান, বান্নু, বাজাউর, খাইবার কিংবা ডেরা ইসমাইল খানের মতো উপজাতি জনগোষ্ঠী বহুল এলাকাগুলিতেও লাগাতার আক্রমণ, বোমাবাজি এবং টার্গেট কিলিং চালিয়ে যাচ্ছে টিটিপি। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় আপার দির এবং বান্নুতে পৃথক হামলায় প্রাণ গিয়েছে তিন পুলিশকর্মীর, জখম হয়েছেন প্রায় ২০ জন। থানা ও নিরাপত্তা ঘাঁটিতে হামলা চালাতে এখন বাণিজ্যিক ড্রোনের ব্যবহারও শুরু করেছে জঙ্গিরা।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পাকিস্তান আর শুধু চেনা ছকের জঙ্গি হামলার মুখে নেই। ড্রোন হামলা, সীমান্ত পেরিয়ে জঙ্গি যাতায়াত, গোয়েন্দা যুদ্ধ এবং অনলাইন প্রচার, সবকিছু মিলিয়ে এক জটিল সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দেশটি। ২০২২ সালের শেষ দিকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে নিজেদের নেটওয়ার্ক নতুন করে গড়ে তুলে টিটিপিকে ঠেকাতে ব্যর্থই হয়েছে ইসলামাবাদ।
রাজনৈতিক বিক্ষোভ
বালোচিস্তান বা খাইবার পাখতুনখোয়ায় যখন সশস্ত্র সংঘাত, তখন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে চলছে রাজনৈতিক আন্দোলন। মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের চড়া দাম, আটার দাম এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (Jammu Kashmir Joint Awami Action Committee বা JAAC)।
মূল বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাদেশিক পরিষদের ১২টি সংরক্ষিত আসন, যা পাকিস্তানের অন্যত্র বসবাসকারী জম্মু-কাশ্মীরের উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলির মাধ্যমেই স্থানীয় রাজনীতিতে নাক গলায় ইসলামাবাদ, দমিয়ে রাখা হয় পিওকে-র বাসিন্দাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর। সন্ত্রাসদমন আইনেই পাক প্রশাসন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেএএসি সংগঠনটিকে। তা সত্ত্বেও থামেনি আন্দোলন। জুলাই মাসের সংঘর্ষে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। রাওয়ালাকোট থেকে মুজফফরাবাদ পর্যন্ত লংমার্চ ঠেকাতে মোতায়েন করা হয়েছিল প্রায় চার হাজার রেঞ্জার্স, পুলিশ ও ফ্রন্টিয়ার কোর জওয়ান।
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার সময়ে তাদের স্বাগতই জানিয়েছিল পাকিস্তান। আশা ছিল, কাবুলের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। টিটিপি নেতাদের আফগান ভূখণ্ড থেকে কাজ চালানোর সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে এখন আফগান তালিবানকেই কাঠগড়ায় তুলছে ইসলামাবাদ। যদিও কাবুলের পাল্টা দাবি, পাকিস্তানের নিরাপত্তা সমস্যা তাদের নিজেদেরই তৈরি, এর সঙ্গে আফগানিস্তানের কোনও যোগ নেই।
করাচিতে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের উপর হামলার পরে আফগান সীমান্ত ঘেঁষা পাখতিয়া, পাখতিকা ও কুনার প্রদেশে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায় পাকিস্তান। রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে দাবি করা হয়েছে, ওই হামলায় সাধারণ নাগরিকও প্রাণ হারিয়েছেন। পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েনি আফগান তালিবানও। চলতি বছরের গোড়ায় পাকিস্তানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও বিমান হামলা চালানোর দাবি করে তারা। ফলে আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা ডুরান্ড লাইন (Durand Line) এখন কার্যত এক সক্রিয় সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সংকটের শাখা-প্রশাখা
একই সময়ে ঘটছে বলে চার সংকটকে পরস্পর সম্পর্কিত মনে হলেও, বাস্তবে এগুলির লক্ষ্য একেবারেই আলাদা। বিএলএ চায় স্বাধীন বালুচিস্তান, টিটিপির লক্ষ্য ইসলামি শাসন কায়েম, জেএএসি চায় রাজনৈতিক অধিকার ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিকার, আর আফগান তালিবানের মূল চিন্তা নিজেদের সরকার এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ। এদের মধ্যে কোনও মিল নেই, বরং কিছু ক্ষেত্রে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীও বটে। তবু একটি জায়গায় মিলে যাচ্ছে সব ক’টি সংকট, একসঙ্গে এত দিক সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পাকিস্তানের সরকার ও সেনা। খোদ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাওয়াজা আসিফ সংসদে স্বীকার করে নিয়েছেন, দু’টি প্রদেশে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
ভেঙে যেতে পারে পাকিস্তান
পাকিস্তান ভেঙে ছোট ছোট দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। আফগানিস্তানের প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি আমরুল্লা সালেহ এমন একটি নতুন দেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার পরে এই আলোচনা বাস্তবের জমি পেয়েছে। যদিও এখনই পাকিস্তানের সীমান্তরেখা বদলে যাওয়ার মতো কোনও প্রমাণ নেই। বালোচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া, পিওকে কিংবা আফগান সীমান্তের আন্দোলনগুলির নেতৃত্ব, দাবি এবং পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু একসঙ্গে এই চার সংকট পাকিস্তানের সামনে হাজির করেছে গত কয়েক বছরের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ। বিশ্লেষকদের একাংশের সতর্কবার্তা, ঘরোয়া চাপ তীব্র হলে সরকার প্রায়শই মনোযোগ ঘোরাতে বহির্সীমান্তে সংঘাতের পথ বেছে নেয়। পাকিস্তান সেই পথে হাঁটে কি না, সে দিকে কড়া নজর রাখছে ভারতও।




