ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই কি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া? পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বা এসআইআরের (Special Intensive Revision, সংক্ষেপে SIR) জেরে যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, এখন ঠিক এই প্রশ্নেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) এবং রাজ্য সরকারকে নোটিস পাঠাল দেশের শীর্ষ আদালত।
আদালতে ঠিক কী হয়েছে?
শুক্রবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ একটি জনস্বার্থ মামলায় নোটিস জারি করে। মামলাকারী প্রসেনজিৎ বসুর হয়ে সিনিয়র আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন সওয়াল করেন, যাঁদের আবেদন স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে খারিজ হয়ে গিয়েছে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের যেন গণবণ্টন ব্যবস্থা (Public Distribution System বা PDS), আন্নপূর্ণা প্রকল্প এবং অন্যান্য আর্থ-সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত না করা হয়। মামলাটি ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে ফের তালিকাভুক্ত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
সমস্যার আসল জায়গাটা কোথায়?
শঙ্করনারায়ণনের দাবি, স্পেশাল ট্রাইব্যুনালগুলিতে এখনও প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন জমে রয়েছে, অথচ এখনও পর্যন্ত মীমাংসা হয়েছে মাত্র প্রায় ৩৮ হাজার আবেদনের। গোটা রাজ্যে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা মাত্র ১৯টি, তার মধ্যে আবার দু’জন বিচারক ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন বলে জানানো হয়েছে আদালতে। অর্থাৎ, যাঁদের মামলা এখনও ঝুলে রয়েছে, তাঁদের ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত ভাবে নির্ধারিত হতে আরও অনেকটা সময় লাগতে পারে। অথচ এর মধ্যেই জুন মাসে রাজ্যের খাদ্য ও সরবরাহ দফতর একটি নির্দেশিকা জারি করে, যাতে বলা হয়, এসআইআরে কার কী শ্রেণিবিভাগ হয়েছে তার উপরেই নির্ভর করবে রেশন ও আন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা মেলা না মেলা। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ারও কথা বলা হয় সেই নির্দেশে।
কতজনের রেশন কার্ড ঝুঁকিতে?
এই একই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে আগেও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল কৃষি শ্রমিক সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি। গত ২৩ জুন তাদের আবেদনে দাবি করা হয়েছিল, এই নিয়মের জেরে রাজ্যে প্রায় ৩৫ থেকে ৬০ লক্ষ রেশন কার্ড নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে, যা সাম্যের অধিকার ও জীবনের অধিকারের পরিপন্থী। তখনও আদালত বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে শুনতে রাজি হয়নি, মামলাকারীদের কলকাতা হাই কোর্টে যেতে বলা হয়েছিল। এর পরে বৃহস্পতিবার মহিবুল্লা মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির মামলাতেও আদালত মৌখিক ভাবে জানায়, এসআইআরে নাম বাদ গেলেও ভর্তুকিযুক্ত রেশনের মতো প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থেকেই যায়। তবে রাজ্য সরকারের জুন মাসের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা খারিজের আর্জি নিয়ে ফের কলকাতা হাই কোর্টেই যেতে বলা হয় তাঁকে।
বিহারের মামলায় আগে কী বলেছিল শীর্ষ আদালত?
বিচারপতি বাগচি এ দিন স্মরণ করিয়ে দেন, বিহারের এসআইআর মামলার রায়েই আদালত স্পষ্ট করেছিল যে, নির্বাচন কমিশন ভোটাধিকার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে না। কারও নাম বাদ দিলে সেই সংক্রান্ত বিষয় নাগরিকত্ব আইনের (Citizenship Act) আওতায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের কাছে পাঠানো কমিশনের দায়িত্ব। অর্থাৎ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার একমাত্র সরাসরি ফল হল ভোটাধিকার হারানো, তার সঙ্গে নাগরিকত্ব বা অন্যান্য সাংবিধানিক অধিকার খারিজের কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেই আগে জানিয়েছিল আদালত। তা সত্ত্বেও বাস্তবে রেশন, আন্নপূর্ণা, জাতি শংসাপত্র বা পরিচয় যাচাইয়ের মতো প্রশ্নে সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিক ভাবে যে হয়রানির মুখে পড়ছেন, সেটাই আদালতে তুলে ধরার চেষ্টা করেন মামলাকারীর আইনজীবী।
এর পরে কী
আপাতত নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকার, দু’পক্ষকেই জবাব দিতে হবে সুপ্রিম কোর্টে, সম্ভবত ২৫ জুলাইয়ের মধ্যেই ফের শুনানি হতে পারে বিষয়টি নিয়ে। ইতিমধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি সূত্রের হিসেব বলছে। সেই তালিকার মধ্যে যাঁদের আপিল এখনও বিচারাধীন, তাঁদের কাছে এই মামলার ফলাফল সরাসরি পেটের প্রশ্ন হয়েই দাঁড়িয়ে।




