আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বার বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলার পর আবেগে ভাসলেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পরে কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনাকে স্মরণ করে তিনি বললেন, তাঁর বিশ্বাস, আর্জেন্টিনার এই সাফল্য উপর থেকে উপভোগ করছেন দিয়েগো। পাশাপাশি ইংল্যান্ডের প্রশংসা করে মেসি জানিয়ে দিলেন, এত কঠিন প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার আনন্দ আরও বেশি।
ম্যাচের পর মেসি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা সব সময়ই স্পেশাল, বিশেষ করে যখন সেটা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। আমরা জানতাম এই ম্যাচ জিততেই হবে, যাতে সমর্থকদের আনন্দ দিতে পারি এবং ফাইনালে উঠতে পারি। আমরা দুর্দান্ত একটা দলের বিরুদ্ধে খেলেছি। ওদের অসাধারণ ফুটবলার রয়েছে, খেলার নিজস্ব দারুণ একটা ধরন রয়েছে। এই দলকে আমি খুব ভাল করে চিনি। ওদের বেশ কয়েকজন ফুটবলারের বিরুদ্ধে খেলেছি, নিয়মিত ওদের খেলা দেখি, কেউ কেউ আবার বার্সেলোনাতেও খেলেছে। তাই জানতাম, ম্যাচটা খুব কঠিন হবে’।
এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘আমাদের কেউই হারতে চাইনি। আর্জেন্টিনার মানুষেরও এই আনন্দের খুব প্রয়োজন ছিল। ওরা ইংল্যান্ডের কাছে হারতে চায়নি। আমরা সেটা করতে পেরেছি, ওদের বিদায় দিয়ে আরও একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছি’।
দলের এই অভিযান নিয়ে মেসির মন্তব্য, ‘আমরা যা অনুভব করছি, যেভাবে সবকিছু এগোচ্ছে, সেটা অবিশ্বাস্য। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই এই দলটার উপর আমার বিশ্বাস ছিল। জানতাম, আমরা শেষ চারের মধ্যে থাকব। আবার একটা ফাইনালে উঠেছি, টানা পঞ্চম বড় ফাইনাল। এটা অবিশ্বাস্য। এই দল আমাকে কখনও অবাক করে না। আমি জানি, এরা কী করতে পারে।’
দলের মানসিক শক্তির প্রশংসা করে মেসি বলেন, ‘অনেকেরই সন্দেহ ছিল। কারণ, কয়েকজন ফুটবলার নিজেদের সীমার শেষ পর্যন্ত ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু এই দল একজোট হলে সব সময় বাড়তি কিছু করে দেখায়। একে অপরকে অনুপ্রাণিত করে, সবার জন্য সবকিছু উজাড় করে দেয়। এমনও অনেকে ছিল, যারা হয়তো এই দলকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু আমি কখনও বিশ্বাস হারাইনি। আমি জানি, এই ছেলেরা কী করতে পারে। যেখানে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই বলে মনে হয়, সেখান থেকেও ওরা শক্তি খুঁজে বের করে। ক্লান্ত হোক বা চোট নিয়ে খেলুক, সব সময় নিজেদের একশোভাগ দেয়।’
টানা দু’বার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘প্রত্যেকটা ফাইনালই আলাদা। প্রত্যেকটার নিজস্ব বিশেষত্ব রয়েছে। আবার সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করা দারুণ ব্যাপার। এই দল যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য—টানা দু’টি বিশ্বকাপ ফাইনাল। ব্যক্তিগতভাবে খুব কম ফুটবলারই তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে। এই বিশ্বকাপ যেভাবে এগিয়েছে, আজকের ম্যাচ, আজকের প্রতিপক্ষ, যেভাবে আমরা জিতলাম—সবকিছুই অবিশ্বাস্য’।
এরপরই মারাদোনাকে স্মরণ করে আবেগঘন বার্তা দেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই দিয়েগো উপর থেকে সব উপভোগ করছেন। এই জয় ওঁর জন্যও একটি উপহার। আজকের দিনটা খুবই বিশেষ।’
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে যেটা করে আসছি, সেটাই করেছি। এই দলের খেলার ধরন খুব স্বাভাবিক ও সাবলীল। আমরা ধৈর্য ধরি, ম্যাচের গতি বুঝে খেলি। প্রথমার্ধে পরিষ্কার সুযোগ না পেলেও ম্যাচ আর বলের দখল আমাদেরই ছিল। ওরা গোল করার পরে আমরা ধৈর্য ধরে বল ঘুরিয়েছি, ওদের পিছনে ঠেলে দিয়েছি এবং পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানতাম, আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে পারলেই সুযোগ আসবে। যা-ই ঘটুক না কেন, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদেরই রাখতে হবে। আজ আমরা ভেতরেও জায়গা পেয়েছি, বাইরেও পেয়েছি। ধৈর্য ধরেছি এবং দীর্ঘদিন ধরে যেটা করে আসছি, সেটাই করেছি। আবারও প্রমাণ করেছি, এই দল সবকিছু করতে সক্ষম’।
২০১৯ কোপা আমেরিকার পর থেকে জাতীয় দলের পথচলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের কোপা আমেরিকায় ফেরার পর থেকে এই দলের সঙ্গে যা কিছু অনুভব করেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সাফল্য, সবকিছু জেতার বাইরেও প্রতিদিন একসঙ্গে থাকা, একসঙ্গে লড়াই করা—এটা ছিল দারুণ একটা যাত্রা। যা সমর্থকদের এত আনন্দ দিয়েছে’।
শারীরিক প্রস্তুতি নিয়ে মেসির মন্তব্য, ‘সেরা অবস্থায় বিশ্বকাপে আসার জন্য আমি যা যা করা দরকার, সব করেছি। এক বছর ধরে প্রচুর প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি সবসময় বলেছি, নিজেকে ভাল অনুভব করে বিশ্বকাপ উপভোগ করতে চাই। কোপা আমেরিকায় আমার শারীরিক অবস্থা সেরা ছিল না। এবার সেই আনন্দ পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি’।
শেষে পরিবারের সঙ্গে সেলিব্রেশনের কথা জানিয়ে মেসি বলেন, ‘এখন স্ত্রী আর সন্তানদের সঙ্গে এই মুহূর্তটা উপভোগ করব। একটু আগেই বাবা, মা, ভাই, কাকা, ভগ্নিপতি—সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। পরিবারে এত আনন্দ, আর আর্জেন্টিনার মানুষকে আরও একবার আনন্দ দিতে পেরে আমরা খুব খুশি’।
সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর শেষ বার্তা, ‘এই মুহূর্তটা উপভোগ করুন। আবারও আমরা বিশ্বের সেরা দুই দলের একটি। এতে প্রমাণ হয়, আমরা যা করেছি তা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয় এবং কেউ আমাদের কিছু উপহার দেয়নি। গত চার বছর ধরে আমরাই সেরা দল—কেউ সেটা পছন্দ করুক বা না-ই করুক’।




