• facebook
  • twitter
  • youtube
Saturday, 11 July, 2026

চিকিৎসকদের উপর হামলা

চিকিৎসকরা যদি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না বোধ করেন, তবে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজকেই বহন করতে হবে

চিকিৎসকদের উপর হামলা

Image: ANI

মহারাষ্ট্রের থানেতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের আবার অস্বস্তিকর এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, এক জনপ্রতিনিধি ও তাঁর অনুগামীরা হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে চিকিৎসকদের মারধর করছেন। এই দৃশ্য যতটা উদ্বেগজনক, তার চেয়েও বেশি চিন্তার বিষয় হলো, এটি কোনও ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তামিলনাড়ু, দিল্লি থেকে উত্তরপ্রদেশ— চিকিৎসকদের উপর হামলার ঘটনা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, দেশের ৭৫ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসক কর্মক্ষেত্রে কোনও না কোনোভাবে হিংসার শিকার হয়েছেন।
এই প্রবণতার পেছনে যে ক্ষোভ কাজ করছে, তার উৎস খুঁজতে গেলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাই সামনে আসে— অপর্যাপ্ত পরিকাঠামো, শয্যার অভাব, চিকিৎসকের ঘাটতি, অসহনীয় ভিড়। রোগী ও তাঁদের পরিবারের হতাশা তাই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সেই হতাশা যদি চিকিৎসকদের উপর গিয়ে পড়ে, তা হলে তা শুধু অন্যায় নয়, বিপজ্জনকও। কারণ চিকিৎসকরা এই ব্যবস্থার নির্মাতা নন, তাঁরা তার মধ্যে কাজ করা কর্মী মাত্র। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তাঁদের প্রতিদিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়— কখনও ‘না’ বলতে হয়, কখনও অপেক্ষা করতে বলতে হয়, কখনও অনিবার্য মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়।

এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের উপর হামলা চালানো সমাজের অসহিষ্ণুতারই পরিচয় দেয়।থানের ঘটনায় আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধি গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, অথচ যাঁরা আক্রান্ত, সেই চিকিৎসকেরাই আতঙ্কে রয়েছেন। একজন ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গিয়েছে, আরেকজন পেশা ছাড়ার কথা ভাবছেন। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট নয়, বরং ভবিষ্যতে চিকিৎসা পরিষেবার উপরও তার গভীর প্রভাব পড়তে পারে।

এখানে মূল সমস্যা শুধু রাগ বা হতাশা নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার। নির্বাচিত হওয়ার অর্থ অনেকের কাছে যেন সীমাহীন কর্তৃত্বের অধিকার পাওয়া। ফলে তাঁরা মনে করেন, হাসপাতালের মতো জায়গাতেও তাঁদের নির্দেশই শেষ কথা। এই মানসিকতা আইনের শাসনকে দুর্বল করে। যদি জনপ্রতিনিধিরাই আইন ভঙ্গ করেন, তবে সাধারণ মানুষের এরকম কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায় যে, ক্ষমতা থাকলে শাস্তি এড়ানো যায়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো, আইনের নির্ভুল ও কঠোর প্রয়োগ। অনেক রাজ্যে চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য আইন থাকলেও, তার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায়শই দেখা যায় না। অথচ অপরাধ রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল শাস্তির নিশ্চয়তা। বিশেষ করে যখন কোনও জনপ্রতিনিধি এই ধরনের অপরাধে জড়িত থাকেন, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে আরও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ তাঁদের দায়িত্ব শুধু আইন মানা নয়, আইনকে সম্মান করার উদাহরণ স্থাপন করা।
একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার জন্য প্রকৃত দায়ও স্পষ্ট করে চিহ্নিত করা দরকার। হাসপাতালের অব্যবস্থা, জনবল সংকট বা পরিষেবার ঘাটতি— এসবই নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতার ফল। এই ব্যর্থতার দায় চিকিৎসকদের উপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং তা আরও গভীর হয়।
অতএব, চিকিৎসকদের উপর হামলার প্রশ্নে কোনও রকম আপস চলতে পারে না। এটি কোনও রাজ্য বা দলের সমস্যা নয়, এটি একটি সর্বভারতীয় সংকট। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সব রাজ্যেই একই বার্তা স্পষ্টভাবে পৌঁছে দিতে হবে— এই অপরাধের শাস্তি হবেই, এবং তা হবে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক।
চিকিৎসকরা যদি নিজেদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ না বোধ করেন, তবে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই সময়, ক্ষমতার দম্ভকে নিয়ন্ত্রণে এনে আইনের শাসনকে প্রতিষ্ঠা করার। নইলে হাসপাতাল, যা মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, সেটিই একদিন ভয়ের জায়গায় পরিণত হবে।