• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 8 July, 2026

সিন্ধু জলচুক্তি: পাকিস্তানের কৌশল

এক সময় বিশ্বে সবচেয়ে স্থিতিশীল জলবণ্টন চুক্তিগুলির একটি হিসেবে পরিচিত ছিল সিন্ধু জলচুক্তি। ১৯৬০ সালে ভারত

সিন্ধু জলচুক্তি: পাকিস্তানের কৌশল

প্রতীকী চিত্র

এক সময় বিশ্বে সবচেয়ে স্থিতিশীল জলবণ্টন চুক্তিগুলির একটি হিসেবে পরিচিত ছিল সিন্ধু জলচুক্তি। ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বহু যুদ্ধ, উত্তেজনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও টিকে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই চুক্তিকে নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর ভারতের সিদ্ধান্ত— চুক্তিটিকে ‘স্থগিত’ রাখা— দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারতের অবস্থান পরিষ্কার। বহু বছর ধরে সীমান্ত পারাপার সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে দিল্লি। পহেলগামে পর্যটকদের উপর প্রাণঘাতী হামলার পর ভারতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। সরকারের মতে, যে দেশ একদিকে শান্তির কথা বলে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়, তার সঙ্গে আগের মতো সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই চুক্তিকে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে তারা নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন হিসেবেই দেখছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে চাইছে। তাদের দাবি, ভারত জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে এবং একই সঙ্গে ভারতের উপর চাপ তৈরি করতে চাইছে। পাকিস্তানের বিভিন্ন মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্যে এই সুর স্পষ্ট। তাঁরা বলছেন, চুক্তি অনুযায়ী জল না পেলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়বে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? পাকিস্তান বারবার দাবি করছে যে, সিন্ধু নদীর ব্যবস্থা তাদের অর্থনীতির প্রাণ। কৃষি, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তারা এই জলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি সমাধান না করে, সব দোষ ভারতের ঘাড়ে চাপানোর প্রবণতা কি যুক্তিযুক্ত? অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা— এই সবকিছু মিলিয়েই পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের যুক্তি হলো, চুক্তি মানতে হলে দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। যদি এক পক্ষ ক্রমাগত এমন কার্যকলাপে জড়িত থাকে যা অন্য দেশের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তবে সেই চুক্তি আগের মতো কার্যকর রাখা কঠিন। দিল্লি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সন্ত্রাসবাদে সমর্থন বন্ধ না হলে চুক্তি পুনরায় চালু করার প্রশ্নই ওঠে না।
পাকিস্তানের আরেকটি কৌশল হলো এই ইস্যুকে কাশ্মীর সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা নতুন নয়। অতীতেও তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের প্রচেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ, অধিকাংশ দেশই এটিকে দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে দেখে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবতা স্বীকার করা। পাকিস্তান যদি সত্যিই চুক্তিকে কার্যকর রাখতে চায়, তবে তাদের প্রথমে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে যে তারা শান্তি চায়। অন্যদিকে ভারতও নিশ্চয় এখনই এমন কোনও পদক্ষেপ নেবে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সিন্ধু জলচুক্তি শুধু একটি জলবণ্টন চুক্তি নয়, এটি দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার একটি প্রতীকও ছিল। সেই প্রতীক আজ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকে এগোনোই একমাত্র পথ। অন্যথায়, জল নিয়ে এই বিরোধ ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের রূপ নিতে পারে।
অতএব, এখন সময় দায়িত্বশীল আচরণের। আন্তর্জাতিক মঞ্চে অভিযোগ তুলে লাভ নেই, যদি নিজের ঘরই গুছিয়ে রাখা না যায়। পাকিস্তানের উচিত নিজেদের নীতিতে পরিবর্তন আনা এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া। তবেই হয়তো আবারও এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে আস্থার সেতু হয়ে উঠতে পারে।