দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
বছর কয়েক আগেও যে অশোকনগর (Ashoknagar) পরিচিত ছিল শুধুই উত্তর ২৪ পরগনার একটা ছোট্ট শহর হিসেবে, সেই অশোকনগরই এবার উঠে আসতে চলেছে দেশের জ্বালানি মানচিত্রে। বাইগাছি এলাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ওএনজিসি-র (Oil and Natural Gas Corporation) উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অপরিশোধিত খনিজ তেল উত্তোলনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। সূত্রের খবর, জুলাই মাসের শেষ দিক থেকেই শুরু হতে পারে এই উত্তোলন প্রক্রিয়া। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে একের পর এক প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে বাস্তবের মুখ দেখতে চলেছে পূর্ব ভারতের প্রথম উল্লেখযোগ্য তৈলক্ষেত্র।
যুদ্ধকালীন তৎপরতা
প্রকল্প এলাকায় এখন দিনরাত কাজ চলছে। প্রথম দফায় যে কূপ খনন করা হয়েছিল, সেখান থেকে প্রত্যাশিত ফল না মেলায় নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অত্যাধুনিক অয়েল ড্রিলিং রিগ ব্যবহার করে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মিটারেরও বেশি গভীরতা পর্যন্ত খনন সম্পন্ন হয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা প্রায় আড়াই হাজার মিটার। প্রতিদিন গড়ে দেড়শো মিটার করে এগোচ্ছেন কর্মীরা। খনন শেষ হলেই বসানো হবে পাম্পজ্যাক, শুরু হবে নিয়মিত তেল তোলার কাজ। মোট সাতটি কূপ খনন করা হয়েছে অশোকনগর জুড়ে, তবে প্রথম পর্যায়ে বাইগাছির একটি কূপ থেকেই কুইক প্রোডাকশন সিস্টেমে উত্তোলন শুরুর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ভুরকুন্ডা ও দৌলতপুরেও চলছে খননকাজ, আর রানাঘাটেও খনিজ তেলের সম্ভাবনার হদিশ মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে উঁচু প্রাচীর দিয়ে, দুই শিফটে কাজ করছেন শতাধিক কর্মী। ভারী যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়ার সুবিধার জন্য প্রকল্প এলাকা থেকে হাবরা-নৈহাটি সড়ক পর্যন্ত নতুন রাস্তা ও আলোকসজ্জার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
মাটির নিচে কত সম্পদ
প্রাথমিক হিসেব বলছে, অশোকনগরের ভূগর্ভে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই ভাণ্ডার থেকে সরাসরি রয়্যালটি ও কর বাবদ প্রায় ৪৫০০ কোটি টাকা যাবে রাজ্যের কোষাগারে। এখনও পর্যন্ত অনুসন্ধান ও পরিকাঠামো খাতে ওএনজিসি বিনিয়োগ করেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। উত্তোলিত তেল পাঠানো হবে হলদিয়ার শোধনাগারে। গুণমানের নিরিখেও অশোকনগরের তেল যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। এর এপিআই গ্র্যাভিটি (API gravity) ৪০ থেকে ৪১ ডিগ্রি, যা একে হালকা ও উন্নত মানের অশোধিত তেলের তালিকায় ফেলে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, গুণমানের বিচারে এই তেল ভারতের অন্যতম প্রধান তৈলক্ষেত্র বম্বে হাই-এর সমতুল্য, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট-এর (West Texas Intermediate) কাছাকাছি। প্রাথমিক উত্তোলন পর্বের পর একই ক্ষেত্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নিয়েছে ওএনজিসি, সম্ভাব্য সময়সীমা আগামী বছরের গোড়ার দিক।
ডবল ইঞ্জিনের বার্তা
প্রকল্পটি নিয়ে রাজনৈতিক কৃতিত্বের লড়াইও স্পষ্ট। রাজ্য বিজেপি সভাপতি তথা রাজ্যসভা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য একাধিকবার সংসদে বিষয়টি তুলেছেন এবং কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গে ধারাবাহিক সমন্বয় রেখেছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। বিজেপি শিবিরের বক্তব্য, দীর্ঘদিন স্ট্যাম্প ডিউটি, রয়্যালটি ও লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্প আটকে ছিল, সেই জট কাটতে সাহায্য করেছে কেন্দ্রের নতুন পেট্রোলিয়াম আইন। রাজ্যে বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে প্রকল্পের গতি বাড়াকে দলীয় স্তরে ডবল ইঞ্জিনের সরকারের সাফল্য হিসেবেই তুলে ধরা হচ্ছে, যদিও এই দাবি সম্পূর্ণত রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, বাস্তবের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া বহু স্তরে বিস্তৃত। প্রকল্পের বিলম্ব নিয়ে সংসদে প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, তেল ও গ্যাস উত্তোলনে সময় লাগাটাই স্বাভাবিক এবং কাজ ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।
আগামী দিনের ছবি
প্রকল্প পুরোদমে চালু হলে অশোকনগর হয়ে উঠতে পারে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উত্তোলন কেন্দ্র। রাজস্ব বৃদ্ধি ছাড়াও কর্মসংস্থান ও শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে স্থানীয় অর্থনীতিতে। তবে জুলাইয়ের শেষে উত্তোলন শুরুর যে সময়সীমা বারবার উঠে আসছে, তা এখনও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। খনন কাজে কোনও প্রযুক্তিগত জটিলতা বা আবহাওয়াজনিত বিলম্ব হলে সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।




