২০১৫ সালে ভারতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ কোটি। ২০২৬ সালে সেটা ছাড়িয়ে গিয়েছে ১০৯ কোটি।
মাত্র এক দশকে তিনগুণেরও বেশি। কিন্তু এই সংখ্যাটা কি শুধু মোবাইলে ইন্টারনেট মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার গল্প? না, এটা অনেক গভীর।
আগামী ১ জুলাই ডিজিটাল ইন্ডিয়া (Digital India) কর্মসূচির ১১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সরকার বলছে, এই ১১ বছরে ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (Digital Public Infrastructure, DPI) গড়ে তুলেছে।
দাবিটা বাড়িয়ে বলা নয়। সংখ্যাই বলছে।
ইউপিআই: বিশ্বের ৪৯ শতাংশ লেনদেন ভারতেই
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হল ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (Unified Payments Interface, UPI)।
২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে ইউপিআই-এ লেনদেন হয়েছিল মাত্র ২ কোটি। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেই সংখ্যা ২৪,১৬২ কোটি। এই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্টের ৪৯ শতাংশ হচ্ছে ভারতে। মানে পৃথিবীর দুটো ডিজিটাল লেনদেনের একটা হচ্ছে ভারতে।
এই সংখ্যাটা শুধু প্রযুক্তির গল্প নয়। এটা আচরণ বদলের গল্প। সবজিওয়ালা থেকে অটোচালক, চায়ওয়ালা থেকে মুদিখানা, সবাই এখন কিউআর কোড (QR Code) নিয়ে বসে আছেন।
ইউপিআই এখন ভারতের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাশাহি (UAE), সিঙ্গাপুর (Singapore), ফ্রান্স (France), মরিশাস (Mauritius), শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka)-সহ আটটিরও বেশি দেশে এখন ইউপিআই সরাসরি ব্যবহার করা যাচ্ছে। সর্বশেষ যোগ দিয়েছে কম্বোডিয়া (Cambodia)।
জ্যাম ট্রিনিটি: ব্যাংক-পরিচয়-মোবাইলের এক অভূতপূর্ব জোট
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার মেরুদণ্ড তিনটি স্তম্ভ, যাকে একসঙ্গে বলা হয় জ্যাম ট্রিনিটি (JAM Trinity): জন ধন যোজনা (Jan Dhan Yojana), আধার (Aadhaar) এবং মোবাইল সংযোগ (Mobile Connectivity)।
জন ধনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল ২০১৫ সালে ১৪.৭২ কোটি। এখন ৫৭.৭৮ কোটি। জমার পরিমাণ ওই সময়ে ছিল ১৫,৬৭০ কোটি টাকা। এখন ২.৯৪ লক্ষ কোটি।
আধার এনরোলমেন্ট ২০১০-১১ সালে শুরু হয়েছিল মাত্র ০.৪২ কোটি দিয়ে। ২০২৬ সালের মার্চে পৌঁছে গিয়েছে ১৪৪ কোটিতে। প্রায় পুরো দেশের মানুষ এখন ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায়।
এই তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে সরকারি সুবিধা সরাসরি মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর (Direct Benefit Transfer, DBT)-এ ১৭৬ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে ৫১ লক্ষ কোটি টাকা। মাঝখানে দালাল নেই, কমিশন নেই, ‘উপরওয়ালা’ নেই।
গ্রামের শেষ প্রান্তে অপটিক্যাল ফাইবার
ভারত নেট (BharatNet) প্রকল্পে লক্ষ্য ছিল ২.২২ লক্ষ গ্রাম পঞ্চায়েত (Gram Panchayat) সংযুক্ত করা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংযুক্ত হয়ে গিয়েছে ২.১৫ লক্ষ, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ। ৭ লক্ষ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার (Optical Fiber Cable) পাতা হয়েছে সারা দেশে।
এই সংখ্যাটা মাথায় রাখুন। একটা দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়া, এটা অনেক উন্নত দেশও পারেনি।
স্বাস্থ্যে বিপ্লব: ডাক্তারের কাছে এখন ফোনেই কনসাল্ট করা যায়
ই-সঞ্জীবনী (eSanjeevani) টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মে ২৪ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৪৮ কোটি পরামর্শ হয়েছে। ২.৩ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত। প্রত্যন্ত গ্রামের রোগী এখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন ফোনে।
অনলাইন রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (Online Registration System, ORS)-এ ২৪ জুন পর্যন্ত ১.৩৭ কোটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সিরিয়াল পেতে আর ভোরবেলা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না অনেক জায়গায়।
ইলেকট্রনিক্সে ভারত এখন দ্বিতীয়
২০১৪-১৫ সালে ভারতে ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন ছিল ১.৯ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে সেটা ১২ লক্ষ কোটি টাকা। প্রায় সাড়ে ছয়গুণ বৃদ্ধি।
মোবাইল ফোন উৎপাদনে ভারত এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। শুধু চিন (China) এগিয়ে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে (IT/ITeS) ২০২৪-২৫ সালে রাজস্ব হয়েছে ২৮৩ বিলিয়ন ডলার। ২,১০০টিরও বেশি গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (Global Capability Centre, GCC) ভারতে স্থাপিত, যেখানে কাজ করছেন ২৬ লক্ষ পেশাদার।
বিশ্বের কাছে ভারতের ডিজিটাল মডেল
ডিজিটাল ইন্ডিয়া এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে। ইন্ডিয়া স্ট্যাক (India Stack) নিয়ে ২৪টি দেশের সঙ্গে সমঝোতাপত্র (MoU) সই হয়েছে। আধারের মডেল দেখতে আসছে মিশর (Egypt), নাইজেরিয়া (Nigeria), ইন্দোনেশিয়া (Indonesia)।
২০২৩ সালে জি-২০ (G20) সভাপতিত্বের সময় ভারত শুরু করেছে গ্লোবাল ডিপিআই রিপোজিটরি (Global DPI Repository), যেখানে ভারতের ডিজিটাল সমাধান বিশ্বের যে কোনও দেশ ব্যবহার করতে পারবে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ইন্ডিয়াএআই ইমপ্যাক্ট সামিট (IndiaAI Impact Summit) আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) শীর্ষ সম্মেলন করল, সেটা ভারত।
যেটুকু এখনও বলা হয়নি
এত সাফল্যের মাঝে কিছু প্রশ্নও রেখে যাওয়া দরকার।
১০৯ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছেন ঠিকই, তবে ডিজিটাল সাক্ষরতার মান এখনও অসম। মোবাইল থাকলেই ডিজিটাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। পাহাড়ি অঞ্চল, আদিবাসী এলাকায় সংযোগ এখনও অনিয়মিত।
ডেটা গোপনীয়তা (Data Privacy) নিয়ে আলোচনা এখনও অসম্পূর্ণ। ১৪৪ কোটি মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য কতটা সুরক্ষিত, সেই প্রশ্নের এখনও পুরোপুরি উত্তর পাওয়া যায়নি।
সাইবার প্রতারণার (Cyber Fraud) ঘটনা বাড়ছে। ডিজিটাল পরিকাঠামো যত বিস্তৃত হচ্ছে, সেই পরিকাঠামোকে ব্যবহার করে প্রতারণার সুযোগও তত বাড়ছে।
এগিয়ে থাকা ভারত, এগিয়ে থাকার চ্যালেঞ্জ
ডিজিটাল অর্থনীতি এখন ভারতের জিডিপির (GDP) ১২ থেকে ১৪ শতাংশ। পরবর্তী দশকে সেটা ২০ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্য।
এই পথ মসৃণ নয়। কিন্তু ১১ বছরে যে রূপান্তর হয়েছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০১৫ সালে যে ছেলেটি কলেজের ফি জমা দিতে ব্যাংক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত, সে আজ ফোনে বসে ট্রেনের টিকিট কাটছে, ভিডিও কলে ডাক্তার দেখাচ্ছে, জমির কাগজ ডিজিলকারে (DigiLocker) রাখছে।
এই পরিবর্তনই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার আসল সাফল্য।




