তারাতলা বিপর্যয়ে মূল মাস্টারমাইন্ড কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৪ জুলাই পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ আলিপুর আদালতের। সেই সঙ্গে পুরো ঘটনার তদন্তের রিপোর্ট ৩ জুলাই জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত । কালীচরণের মাথায় কার হাত ছিল সেটাই মূলত খুঁজছে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ। তবে এর আগেও কালীর বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময় কলকাতা পুরসভার মেয়র ছিলেন ফিরহাদ হাকিম। দীর্ঘদিন মেয়রের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে কলকাতা পুরসভার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, বিশেষ করে বিল্ডিং বিভাগের ছাড়পত্র দেওয়া হত কালীর অঙ্গুলীহেলনে। যদিও তারাতলায় বিপর্যয়ে হাত তুলে নিয়েছে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। কিন্তু তার দায় কি এড়িয়ে যেতে পারেন? প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
জানা গিয়েছে, বিল্ডিং বিভাগ থেকে লাইসেন্স বিভাগ, সদর দপ্তর থেকে বরো অফিস, প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্তরে ছিল তাঁর প্রভাব। ডিজি থেকে অন্যান্য আধিকারিকদের পদোন্নতি, বদলি কিংবা দায়িত্ব বণ্টন, সব ক্ষেত্রেই নাকি ছিল তাঁর সক্রিয় ভূমিকা। বিশেষ করে বিল্ডিং বিভাগ কার্যত তাঁর নিয়ন্ত্রণেই চলত বলে অভিযোগ। কালীচরণের অজ্ঞাতে কোনও নির্মাণ সংক্রান্ত ফাইলই এগোত না। নিজের পছন্দের আধিকারিকদের বছরের পর বছর একই বিভাগে বহাল রাখার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০১০ সাল থেকে কলকাতা পুরসভার সঙ্গে কাজ শুরু করেন কালীচরণ। সোশ্যাল সেক্টরের চিফ ম্যানেজার এবং ফিরহাদ হাকিমের আপ্তসহায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তখন ফিরহাদ হাকিম পুরসভার রাস্তা বিভাগের মেয়র পারিষদ ছিলেন। পরে ২০১৮ সালে ফিরহাদ হাকিম মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করলে কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের ওএসডি হিসেবে নিয়ে আসেন। এরপর সময় যত গড়িয়েছে, ততই কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক অন্দরে বেড়েছে কালীচরণের প্রভাব ও কর্তৃত্ব।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যে ক্যামাক স্ট্রিটের নাম উঠে এলেও, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কালীচরণের বিরুদ্ধে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিল ক্যামাক স্ট্রিট। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসের তরফে শেক্সপিয়র সরণি থানায় দায়ের করা অভিযোগে দাবি করা হয়, কালীচরণ নিজেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছেন। যদিও সেই সময় প্রকাশ্যেই কালীচরণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ফিরহাদ হাকিম।
তৎকালীন মেয়র বলেছিলেন, ‘যদি এমন কোনও অভিযোগ থাকে, আমাকেই তো বলতে পারত। আমি বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা করতাম। এখন একটা মানুষের নামে যদি এমন কোনও অভিযোগ আসে, যার ভিত্তি নেই, তাঁকে আমি কী করে সরাব?’প্রশাসনিক জীবনের শুরু থেকেই মেধার ছাপ রেখেছিলেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (ডব্লিউবিসিএস) পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরে যোগ দেন তিনি।
এরপর ২০০৬ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিস (ডব্লিউবিপিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে রাজ্য পুলিশে যোগদানের সুযোগ পান। যদিও প্রশিক্ষণ চলাকালীন সেই চাকরি ছেড়ে পুনরায় ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তরে ফিরে যান। পরবর্তীকালে কলকাতা পুরসভায় দায়িত্বভার গ্রহণের পর ধীরে ধীরে প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন কালীচরণ। তবে তাঁর উত্থানের পাশাপাশি ক্ষমতার পরিধি এবং প্রশাসনিক প্রভাব নিয়েও বারবার প্রশ্ন উঠেছে। তারাতলা বিপর্যয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে সেই বিতর্কই আবার নতুন করে সামনে চলে এসেছে।




