একেই চলতি বিশ্বকাপে তিনি রয়েছেন দুরন্ত মেজাজে। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে তাঁর অসাধারণ হ্যাটট্রিকের পর দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোলের আনন্দ উদযাপন করতে করতেই হাঁফিয়ে উঠেছেন মেসি-ভক্তরা। তার ওপর বুধবার ছিল লিওনেল মেসির ৩৯তম জন্মদিন। তাই কলকাতায় আজ যেন খুশির সীমা নাই।
দুপুরের বৃষ্টিতে যেমন ভাসল শহর, তেমনই এ শহরের বিভিন্ন মেসি-ভক্তদের পাড়া গুরুদেবের ‘হ্যাপি বার্থডে’-র আনন্দ ও আবেগে ভেসে গেল। এমন আনন্দের সমুদ্রে ভাসার খবর ভেসে এল ভারতের আর এক ফুটবল-পাগল রাজ্য কেরালা থেকেও। সেখানে আবার নিজের জন্মদিনে এক ভক্তকে বার্তা পাঠিয়েছেন স্বয়ং মেসিই। ঈশ্বরের বার্তা পেয়ে তাই সেখানেও আনন্দের জোয়ার।
মেসির জন্মদিনে উৎসবের আবহে গমগম করছে উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুর। সেখানকার নবাবগঞ্জে কেক কাটা থেকে শুরু করে রক্তদান শিবির—ভক্তদের সেলিব্রেশনের মধ্যে কী নেই? বৃহস্পতিবার সকালে ইছাপুরের মেসি ফ্যান ক্লাবের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি।
প্রিয় তারকার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে কেক তো কাটা হলই, এমনকী রক্তদান শিবির, দরিদ্র-ভোজন এবং ফুটবল প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়েছিল। আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রভিন্সে মেসি যেখানে জন্মেছিলেন, সেই রোজেরিওতেও এমন উৎসবের আয়োজন ছিল কি না, জানা নেই।
ফিরে আসা যাক ইছাপুরের নবাবগঞ্জে, যেখানে এক চা বিক্রেতা তাঁর বাড়ি রঙ করেছেন নীল-সাদা রঙে। মেসির বিশাল কাট-আউট, আর্জেন্টিনার পতাকা এবং নীল-সাদা বেলুনে সাজানো হয় গোটা অঞ্চল। সকাল থেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেন বিভিন্ন বয়সের ফুটবলপ্রেমীরা। মেসির জার্সি গায়ে দিয়ে বহু সমর্থক হাজির হন অনুষ্ঠানে।
ইছাপুর মেসি ফ্যান ক্লাবের এক সদস্য বলেন, “মেসি শুধু আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর জন্মদিন আমরা প্রতি বছরই সামাজিক কাজের মাধ্যমে উদ্যাপন করার চেষ্টা করি।” সমাজের সব স্তরের মামুষের সঙ্গে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই প্রতিবছরের মতো এবারও রক্তদান শিবির ও খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা।বিশ্বকাপের মাঝেই মেসির জন্মদিন পড়ায় উচ্ছ্বাস ছিল আরও বেশি।
অনুষ্ঠানের শেষে কেক কেটে মেসির দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করেন ভক্তরা। আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। ইছাপুরের এই সেলিব্রেশন ফের প্রমাণ করল, আর্জেন্টিনার মহাতারকা শুধু নিজের দেশেই নন, সুদূর পশ্চিমবঙ্গেও সমানভাবে জনপ্রিয় এবং আবেগের নাম।
উৎসাহে ঘাটতি নেই শ্যামবাজারের গণপতি সেবাদলের সদস্যদেরও। তাঁরাও প্রতিবছর মেসির জন্মদিন পালন করেন ধুমধাম করে। এখানে আবার কচিকাচাদের ভীড় বেশি। সবাইকে মেসির মুখোশ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল এ দিন এবং সেই মুখোশ পরেই মেসির জন্মদিনের কেক কাটে তারা। তার পরে মেসির নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে আনন্দ করে কেক খাওয়া।
মেসি যদি এমন সেলিব্রেশনের কথা জানতেন, তা হলে বোধহয় ফের কলকাতায় আসার বায়না ধরতেন। তবে তাঁর জন্মদিনে যে এ দেশের কিছু অংশের মানুষ আনন্দ করে তা উদযাপন করেন, তা কিছুটা হলেও টের পেয়েছেন কেরালার এক অন্ধ ভক্তের জন্য।
কেরালার সেই ভক্ত মেসিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন। সেই শুভেচ্ছার জবাব দিয়েছেন স্বয়ং মেসি! এমন এক উপহার পেয়ে যে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠবেনই সেই ফুটবলপ্রেমী, এটাই তো স্বাভাবিক। কেরলের এক মেসি-ভক্ত ইয়াদিল ইকবাল স্প্যানিশ ভাষায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান।
এক ভিডিও বার্তায় ইয়াদিল মেসির উদ্দেশে বলেন, “শুভ জন্মদিন, লিও। ভারতের কেরালা থেকে তোমার জন্য অনেক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা রইল। তোমার অন্যতম বড় ভক্ত হিসেবে, ২০২১ সালে মারাকানায় কোপা আমেরিকায় আমাদের ঐতিহাসিক জয়ের পর আমি আমার জন্মস্থান কেরলের কোডুঙ্গাল্লুরে তোমাকে উৎসর্গ করে এই ম্যুরালটি তৈরি করেছিলাম।”
তিনি আরও লেখেন, “কাতার বিশ্বকাপে আমাদের ঐতিহাসিক জয়ের পর আমি তোমার একটি মূর্তিও তৈরি করেছি। আমি আশা করি, একদিন তুমি আমার তৈরি করা এই সবকিছু নিজের চোখে দেখতে আসবে, আমাকে চিনতে পারবে এবং তোমার সম্মানে তৈরি করা এই শ্রদ্ধার্ঘ্যটি এসে দেখবে। তোমার অন্যতম বড় একজন ভক্ত হিসেবে সেটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
তাঁর এই আন্তরিক বার্তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা পৌঁছে যায় মেসির কাছেও। সেই ভক্ত তো বটেই সারা ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের চমকে দিয়ে মেসি সেই শুভেচ্ছার উত্তর দেন স্প্যানিশ ভাষায়। তিনি লেখেন, “Muchas gracias por tu mensaje y por el cariño de siempre.”, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “তোমার শুভেচ্ছা এবং সবসময়ের ভালোবাসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।” মেসির এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু আন্তরিক বার্তা মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
বাংলার মতো কেরালাতেও মেসির জনপ্রিয়তা বহুদিনের। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা কিংবা ক্লাব ফুটবল— সব ক্ষেত্রেই আর্জেন্টাইন মহাতারকাকে উৎসবে মেতেছে তারা। অতীতেও কেরালার সমর্থকদের বিভিন্ন উদ্যোগ মেসির নজর কেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও শিরোনাম হয়েছে।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল এই ভক্তের জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কোটি ভক্তের মাঝে থেকেও একজন ভক্তের বার্তার জবাব দিয়ে মেসি আবারও প্রমাণ করলেন, মাঠের বাইরে সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা আন্তরিক এবং হৃদয়স্পর্শী। সেই জন্যই তো তিনি এত প্রিয় ও কাছের।




