ঘানার বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্রয়ের পর শুধু মাঠের লড়াই নয়, মাঠের বাইরের দ্বৈরথও চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের তারকা জুড বেলিংহামের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ। তাঁর দাবি, ইংলিশ মিডিয়া ও ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা ঘানাকে অসম্মান করেছে।বোস্টনে বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এল’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দারুণ রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে গোলশূন্য ড্র করে ঘানা। ম্যাচ শেষে বেলিংহ্যাম প্রতিপক্ষের খেলার ধরন নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘ঘানা মূলত রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। ওদের বিরুদ্ধে সুযোগ তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
এই মন্তব্য ঘানা শিবির ভালোভাবে নেয়নি। সাংবাদিক সম্মেলনে কার্লোস কুইরোজ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমার মনে হয় ইংল্যান্ডের খেলোয়াড় ও মিডিয়ার উচিত অন্য দলগুলোর প্রতি আরও বেশি সম্মান দেখানো। ঘানা এখানে শুধু ডিফেন্স করার জন্য আসেনি।আমরা মাঠে নেমেছিলাম জয়ের জন্য। আমরা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছি এবং ইংল্যান্ডকে সমস্যায় ফেলেছি। আমার মনে হয় না যে, কেউ বলতে পারবে যে আমরা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিফেন্স করেছি।’
ইরান, পর্তুগাল ও মিশরের মতো জাতীয় দলের কোচ হিসেবে কাজ করা অভিজ্ঞ কুইরোজ ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতিকেও খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘ইংল্যান্ড সব সময় মনে করে তারাই ফুটবলের গুরু। কিন্তু ফুটবল এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য দেশগুলিও খেলতে জানে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে জানে।”অন্যদিকে বেলিংহ্যাম নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি ঘানাকে অসম্মান করতে চাননি। ইংল্যান্ড মিডফিল্ডারের কথায়, “আমি শুধু বলতে চেয়েছি যে তারা খুব সংগঠিত ছিল এবং আমাদের জন্য জায়গা তৈরি করা কঠিন করে তুলেছিল। এটা সমালোচনা নয়, বরং তাদের রক্ষণভাগের প্রশংসা।’
ম্যাচে ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি সুযোগ নষ্ট হয়। হ্যারি কেন সহজ একটি সুযোগ মিস করেন, নিকো ওরাইলির হেড ক্রসবারে লাগে এবং মার্ক গেহির একটি হেড গোললাইন সেভ করে ঘানার রক্ষণভাগ। ফলে জয় ছাড়াই মাঠ ছাড়তে হয় থমাস টুখেলের দলকে।
ম্যাচ শেষে কুইরোজ আবারও তাঁর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে গর্ব করে বলেন, “আমার খেলোয়াড়রা অসাধারণ লড়াই করেছে। আমরা দেখিয়েছি যে ঘানা বিশ্বকাপে শুধু অংশ নিতে আসেনি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও এসেছে।”
ধর্ষনে অভিযুক্ত পার্তের সঙ্গে করমর্দন নয়
এ দিন ম্যাচের আগেই আর এক ঘটনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের খেলোয়াড়রা ফিফার নিয়ম অনুযায়ী একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন। তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্স তাঁর ডান হাত পকেটেই রেখে দেন যখন পার্তে তাঁর সামনে আসেন। অন্য ইংল্যান্ড ফুটবলাররা পার্তের সঙ্গে হাত মেলালেও স্পেন্সকে তা করতে দেখা যায়নি। পার্তে মুহূর্তের জন্য বিস্মিত হয়ে পিছনে তাকান, তার পর এগিয়ে যান।
ঘটনার পরপরই গ্যালারিতেও পার্তেকে ঘিরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।স্টেডিয়ামে ঘানার তারকার নাম ঘোষণা হওয়ার সময় ইংল্যান্ড সমর্থকদের একাংশ তাঁকে বিদ্রুপ করে। ম্যাচ চলাকালীন তিনি যখনই বল স্পর্শ করেন, তখনও গ্যালারির একটি অংশ থেকে তাঁর উদ্দেশ্যে শিস ও বিদ্রূপধ্বনি শোনা যায়। কিন্তু কেন তাঁকে এত অপছন্দ সবার? আসলে এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে পার্তেকে ঘিরে চলমান আইনি মামলা।
ইউকে-তে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণ ও যৌন নিগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তবে পার্তে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। মামলার বিচার আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা। আগেই পার্তের দলে অন্তর্ভুক্তিকে সমর্থন করেছিলেন ঘানার কোচ কুইরোজ। তিনি নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন ফুটবলারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি।
পেনাল্টি না পেয়ে ক্ষুব্ধ ঘানা
ম্যাচ চলাকালীনও আর এক বিতর্কে সরগরম হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড-ঘানা ম্যাচ। ম্যাচের শেষদিকে ঘানাকে স্পষ্ট পেনাল্টি না দেওয়ায় রেফারি ও ভিএআরের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে। ম্যাচের শেষ পর্যায়ে ঘানার ফরোয়ার্ড প্রিন্স কোয়াবেনা আদু ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়লে ডিফেন্ডার এজরি কনসার সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয়। রিপ্লেতে দেখা যায়, কনসা বল স্পর্শ না করেই আদুকে ফেলে দেন। কিন্তু রেফারি সাঈদ মার্টিনেজ খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বহু প্রাক্তন ফুটবলার, বিশ্লেষক এবং সমর্থক দাবি করেন, এটি ছিল ‘পরিষ্কার পেনাল্টি’। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের অভিযোগ, বড় দল হওয়ার সুবিধা পেয়েছে ইংল্যান্ড। ঘানার কোচ কুইরোজও ক্ষোভ লুকিয়ে রাখেননি। ম্যাচের পর তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত রেফারিদের নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না। কিন্তু আজকের সিদ্ধান্তগুলো বোঝা কঠিন। আমার খেলোয়াড়রা জয়ের জন্য লড়াই করলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমাদের বিপক্ষে গিয়েছে।’
ঘানার শিবিরের দাবি, শুধু পেনাল্টির ঘটনাই নয়, ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে ৫০-৫০ সিদ্ধান্তও ইংল্যান্ডের পক্ষে গিয়েছে। ফলে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়লেও ঘানা শিবির বেশ হতাশই হয়ে পড়ে। বিশ্ব ফুটবলে ভিএআর প্রযুক্তি চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কমিয়ে আনা। কিন্তু ঘানা-ইংল্যান্ড ম্যাচের ঘটনাটি আবারও সেই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ম্যাচের পর ঘানা শিবিরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— যদি একই ঘটনা ইংল্যান্ডের পক্ষে ঘটত, তাহলে কি পেনাল্টি দেওয়া হতো? এই প্রশ্নের উত্তর আর বোধহয় পাওয়া সম্ভব না।




