রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই ছিল বাড়তি প্রত্যাশা। ক্ষমতায় আসার আগে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার প্রতিফলন কতটা দেখা গেল প্রথম বাজেটে, সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে। সামাজিক সুরক্ষা, নারীকল্যাণ, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং সরকারি কর্মীদের প্রাপ্য প্রায় সব ক্ষেত্রেই একাধিক বড় ঘোষণা করেছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের পেশ করা বাজেটে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। এই প্রকল্পে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, তৃণমূল সরকারের আমলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মহিলাদের জন্য নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান সামাজিক প্রকল্প হিসেবে উঠে এসেছে অন্নপূর্ণা যোজনা।
নারী ক্ষমতায়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গৃহবধূদের ক্লাউড কিচেন চালুর ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা, নারীশক্তি ও দেবীশক্তি প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রসূতিদের জন্য ২১ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান, সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের জন্য ‘পিঙ্ক কার্ড’-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি কাঁথি, কালিয়াচক ও ফলতায় মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রস্তাব এবং সমস্ত স্কুলে স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
আরজি কর-কাণ্ডের পর নারী নিরাপত্তা রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। সেই বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। প্রতিটি মহকুমায় মহিলা পুলিশ থানা, থানাগুলিতে নারী সহায়তা ডেস্ক এবং শহরাঞ্চলে ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া রাজ্য রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সে মাতঙ্গিনী হাজরা ও রানি রাসমণির নামে দু’টি মহিলা ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে। বয়স্ক, বিশেষভাবে সক্ষম ও বিধবা ভাতায় মাসিক ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭ কোটি মানুষকে আনার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এই খাতে বরাদ্দ হয়েছে ৩,১০০ কোটি টাকা। আশা কর্মী এবং ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ নাগরিকদেরও এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বেকার যুবকদের জন্য ‘ভরসা কর্মসূচি’ বা যুবশক্তি প্রকল্পে স্নাতক বেকারদের মাসিক ৩ হাজার টাকা এবং অন্যান্য যোগ্য প্রার্থীদের ২ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এর জন্য পরিবারের বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকার কম হতে হবে এবং অন্য কোনও সামাজিক প্রকল্পের সুবিধাভোগী হওয়া যাবে না।
দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনরত আশা ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের জন্যও বড় ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁদের মাসিক সম্মানী ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। একইভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ, গ্রিন পুলিশ, হোমগার্ড এবং এনভিএফ কর্মীদেরও মাসিক ২ হাজার টাকা করে আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সিভিক ভলান্টিয়ারদের ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন ও পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া চালু হবে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। রাজ্য সরকারি এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পুলিশে ২০ হাজার এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী দু’বছরের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় পাঁচ বছরের ছাড় দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের ডিএ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের জন্য আরও ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে ডিএর হার ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছবে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে কেন্দ্র ও রাজ্যের ডিএ-র ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করা হবে।
বাজেটে বিধায়ক তহবিলও বাড়ানো হয়েছে। বার্ষিক ৭০ লক্ষ টাকা থেকে তা বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহারে উৎসাহ, বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ভর্তুকি, প্রতিটি কৃষক পরিবারকে মাসিক ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা, ফুলচাষিদের জন্য ক্লাস্টার এবং আলুচাষিদের জন্য হিমঘর নির্মাণের মতো একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখেই এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। তবে শিল্পায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই বাজেট কতটা কার্যকর হয়, তার মূল্যায়ন করতে এখনও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে রাজ্যবাসীকে।




