আগামী ৩১ শে জুলাই পর্যন্ত যে সমস্ত হকারদের চূড়ান্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে সেই সমস্ত হকারদের আর নতুন করে উচ্ছেদ করা যাবে না। আর উচ্ছেদ করার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সশরীরে পরিদর্শনে গিয়ে তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং আদালতে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দিতে হবে, এমনই নির্দেশ দিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিরণময় ভট্টাচার্য।
হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিরণময় ভট্টাচার্যের এজলাসে ২৫ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার সেই মামলার শুনানিতে বিচারপতি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে জানান, বেশ কিছু রেল স্টেশন সংলগ্ন জায়গায় নোটিস দেওয়া হলেও, বাস্তবে সেই জমি রেলের কি না প্রশ্ন আছে। এই অবস্থায় আগে রেলকে এইসব জায়গায় ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন করে আগামী দিনে রিপোর্ট দিতে হবে।
রাজ্যের পালা বদলের পর একের পর এক অপারেশন কোথাও বেআইনি নির্মাণ ভেঙে ফেলা আবার কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে হকার উচ্ছেদ যা নিয়ে সরগরম হয়েছে বঙ্গ রাজনীতি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ইস্যুকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু করেছে। কলকাতার রাজপথে মিছিল, অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন। পিছিয়ে নেই রাজ্যের বামপন্থী সংগঠনগুলোও। তারাও পথে নেমে আন্দোলন করছে। গত প্রায় এক মাসে শহর এবং শহরতলি মিলিয়ে কয়েক হাজার বেআইনি হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। হাওড়া স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। শতাধিক অস্থায়ী দোকান ও হকার সরানো হয়েছে।শিয়ালদহ, নিউ মার্কেট, গড়িয়াহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় হকার উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান হয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগণা বারুইপুর ও যাদবপুর স্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ ঘিরে আন্দোলন ও প্রতিবাদের পথে নেমেছিল সাধারণ মানুষ।
আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সেখানে নতুন করে আগের নোটিস কার্যকর করা যাবে না। আদালতের বক্তব্য, যাদের কোনো সময়ে রেল বসার যাদের অনুমতি দিয়েছিল তাদের ক্ষেত্রে আগামী দিনে রেল তাদের অবস্থান জানাবে রিপোর্ট দিয়ে। কারণ কিছু ক্ষেত্রে উচ্ছেদ করার আগে বিকল্প জায়গার বিষয়টাও বিবেচনা করে আদালতে জানাতে হবে রেলকে।
মামলাকারীদের পক্ষের আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য আদালতে জানান,যেভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে তাতে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। কেন্দ্র বা রাজ্য কেউ এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। জীবনের অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সমাজের দুর্বল শ্রেণির মৌলিক অধিকার কোনো কারণ দেখিয়ে খর্ব করা যায় না। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে তাদের সাহায্য করার কথা। ঠেলা গাড়ি, ঝুপড়ি দোকান করে হাজার হাজার পরিবার সংসার চালাচ্ছে। বলা ভালো চালাতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের উপর আরও চাপ বাড়ানো সরকারের কাজ হতে পারে না। রাষ্ট্র তাদের শত্রু হিসেবে আচরণ করতে পারে না। অথচ এখানে হঠাৎ বুল ডোজার পাঠিয়ে ভেঙে চুরে সব শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরাতে কোনো না কোনো জায়গায় লোকজন রাত পাহারা দিয়ে বসে থাকছেন। তাতেও বুলডোজার হামলা থেকে বাঁচতে পারছে না। যখন কেউ রেলের জমিতে বসে পরছে, তখন তাকে বাধা না দিলে ২-৩ দশক পর তাকে উচ্ছেদ করা যাবে না, এটা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে আছে। আগে তাদের বিকল্প জায়গা দিয়ে উচ্ছেদ করা হোক।
আইনজীবীর বক্তব্যের পরিপেক্ষিতে বিচারপতি প্রশ্ন করেন ,রেলের জায়গা, প্ল্যাটফর্ম যদি দখল করে দোকান বসে তুলবে না? কিছু ক্ষেত্রে রেল স্টল করে বসার ব্যবস্থা করেছিল। তাদের উচ্ছেদের ঘটনা কি আছে? লাইসেন্স আছে এমন লোকেদের তুলেছে?
উত্তরে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন,বহু ক্ষেত্রে প্যাসেঞ্জার অভিযোগ করছে বলে প্ল্যাটফর্ম ও রেলের রাস্তা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। বারুইপুর ১৯৯৫ থেকে সেখানে লাইসেন্স পায় রেলের। ৪০ টা পরিবার। কোনো ডেট, সই ছাড়া নোটিস দিয়েছে।
এর পরই বিচারপতি বলেন এদের মধ্যে মাত্র দুজনের লাইসেন্স ছিল। তাই আপাতত এই দুজনের ক্ষেত্রে রেল কি করবে আগামী দিনে জানাক। হুগলি নদী জলপথ থেকে লাইসেন্স নিয়ে কিছু বাসিন্দা বসেছিল। তাদেরও নোটিস দেওয়া হয়েছে। স্টেশন থেকে প্রায় ১ কিমি দূরে ডানকুনিতে। সেখানেও নোটিস দেওয়া হয়েছে। ৩২ টি পরিবারের দোকান, বাসস্থান আছে।
রেলের তরফে আদালতে জানানো হয় ১৮৮১ সালে তাঁদের ওই জমি কিনে নেওয়ার ন্যূনতম দাম জমা দেওয়ার নোটিস দেওয়া হয়েছিল। তা আজ পর্যন্ত কেউ জমা দেয়নি। যদিও আদালত জানিয়েছে জুন মাস পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নয়।
অন্যান্য মামলাকারিদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে গুমা স্টেশনের বাইরে রেলের জায়গা কি না তাই নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমাদের লাইসেন্স ও বিদ্যুতের লাইন আছে। কিন্তু রেলের কোনো নথি নেই। স্টেশনের বাইরে ওই জায়গা রেলের কি না আমরা জানি না। তবে বিচারপতি জানিয়েছেন, রেলকে নিজের জায়গা আগে চিহ্নিত করতে হবে। ম্যাপ এক জিনিস, আর ফিজিক্যাল সেই জায়গা তাদের কি না, সেটা আরেক। আগে রেলকে সেইসব প্রশ্নের মুখে থাকা জায়গা গুলিকে ফিজিক্যালি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দিতে হবে।
পাশাপাশি অন্য এক মামলাকারির আইনজীবি জানায়,একজন ছাড়া কেউ রেলের জায়গা য় বসবাস করে না। অথচ সবাইকে উচ্ছেদ নোটিস দেওয়া হয়েছে। এমন কি পুরসভার জায়গায় মার্কেট থেকেও উচ্ছেদ নোটিস দেওয়া হয়েছে। তারপরেই স্পষ্টভাবে বিচারপতি হিরণময় ভট্টাচার্য নির্দেশ দেন, জুলাই পর্যন্ত দায়ের হওয়া ২৫ টি মামলায় কোনোরকম উচ্ছেদ করা যাবে না।




