• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 7 June, 2026

দল ও তারকার মেলবন্ধন

ভারতীয় ক্রিকেটে এখন এক নতুন দর্শনের পরীক্ষা চলছে। যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলগত কাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভারতীয় ক্রিকেটে এখন এক নতুন দর্শনের পরীক্ষা চলছে। যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলগত কাঠামোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচক কমিটির প্রধান অজিত আগারকর এবং কোচ গৌতম গম্ভীর যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তার মূল কথা— কেউই অপরিহার্য নয়। এই নীতির সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ সূর্যকুমার যাদব।
মাত্র তিন মাস আগে তিনি ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে দল দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে— ৫২ ম্যাচে ৪০টি জয়, কোনও দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হার নেই। তবু আজ তিনি অধিনায়কত্ব হারাতে চলেছেন, এমনকি দল থেকেও বাদ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনেকের কাছে এটি অবিচার মনে হতে পারে, কিন্তু বর্তমান টিম ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টিতে এটি একেবারেই পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
এই নীতির প্রয়োগ নতুন নয়। রোহিত শর্মার টেস্ট ক্যারিয়ারের পতনকে দীর্ঘায়িত করা হয়নি, সরাসরি ইতি টানা হয়েছে। তারপরই বিরাট কোহলিও অবসর নিয়েছেন। শুভমন গিল— যিনি একসময় ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে বিবেচিত— তাঁকেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মহম্মদ শামির দীর্ঘ অনুপস্থিতিও একই ভাবনার প্রতিফলন। অর্থাৎ, অতীতের অবদান নয়, বর্তমান ফর্মই শেষ কথা।
সূর্যকুমারের ক্ষেত্রেও সেই একই অঙ্ক কাজ করেছে। আইপিএলে ১৩ ইনিংসে মাত্র ২৭০ রান, গড় ২০.৭৭— এই পরিসংখ্যান নির্বাচকদের সিদ্ধান্তকে সহজ করে দিয়েছে। এখানে আবেগের কোনও জায়গা নেই, কেবল সংখ্যার নিরিখে বিচার।
তবে প্রশ্ন উঠছে, শুধু পরিসংখ্যান কি সব? খেলাধূলা কি শুধুই ফলাফলের খেলা? না কি এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, অনুপ্রেরণা এবং নায়ক তৈরির প্রক্রিয়া?
প্রাক্তন কোচ রাহুল দ্রাবিড় এই প্রসঙ্গে এক ভিন্ন মত পেশ করেছিলেন। তাঁর মতে, কোনো খেলাই নায়ক ছাড়া বাঁচতে পারে না। একজন কিংবদন্তি তৈরি হন দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এবং সেই প্রক্রিয়ায় তিনি দলকেও জিততে সাহায্য করেন। অর্থাৎ, দল এবং তারকা— এই দুই একে অপরের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
এই বিতর্কের মধ্যেই আবির্ভাব ঘটেছে এক নতুন তারকার— মাত্র ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশী। চলতি আইপিএলে তাঁর ৭৭৬ রান এবং ২৩৭.৩১ স্ট্রাইক রেট শুধু পরিসংখ্যান নয়, এক ধরনের উন্মাদনার সৃষ্টি করেছে। দর্শকরা এখন দল দেখতে নয়, তাঁকে দেখতে মাঠে আসছেন। তিনি ইতিমধ্যেই ‘বক্স অফিস’ আকর্ষণ।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। একদিকে এমন একটি সিস্টেম, যা ব্যক্তিপূজাকে নিরুৎসাহিত করে; অন্যদিকে এমন এক প্রতিভা, যাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হচ্ছে নায়কোচিত আভা। এই দুইয়ের সংঘাত কীভাবে সামলানো হবে?
কঠোর নীতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। কখনো কখনো পরিস্থিতি অনুযায়ী নমনীয়তা দেখাতে হয়। কারণ ক্রিকেট কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঘটনা। এখানে মানুষের আবেগ, প্রত্যাশা এবং কল্পনার জগৎ জড়িয়ে থাকে।
ভারতীয় ক্রিকেটের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ— দলগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে এমন নায়কদের জায়গা দেওয়া, যারা প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সামনে রয়েছে ২০২৮ অলিম্পিক্স এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক জয়ের লক্ষ্য। এই প্রেক্ষাপটে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব, প্রশ্নটা সরল নয়— দল না তারকা? বরং সঠিক প্রশ্ন হওয়া উচিত— কীভাবে দল এবং তারকার মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা যায়। সূর্যকুমারের ঘটনা দেখিয়ে দিল, বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত কৃতিত্বের মূল্য কমে যেতে পারে। আবার বৈভব সূর্যবংশীর উত্থান মনে করিয়ে দিচ্ছে, নায়ক তৈরির প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত, ভারতীয় ক্রিকেট কোন পথ বেছে নেবে— শুধু নীতির কঠোরতা, নাকি আবেগের জায়গা রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ— সেই সিদ্ধান্তই আগামী দিনের সাফল্য নির্ধারণ করবে।