আড়াই দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক জীবনে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছেন তিনি। রাজনীতির ময়দানে লড়াই, বিতর্ক, সংঘাত, সবকিছুর মধ্য দিয়েই নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা অর্জুন সিং। তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনৈতিক উত্থান, পরে বিজেপিতে যোগদান, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং একের পর এক আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন তিনি।
পাঁচবারের বিধায়ক ও একবারের সাংসদ অর্জুন সিংয়ের রাজনৈতিক জীবনে এটি নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়। দৈনিক স্টেটসম্যানকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নবনিযুক্ত মন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার একটি আক্ষেপ তাঁর মধ্যে ছিল। সেই প্রসঙ্গে অকপটে তিনি বলেন, ‘আক্ষেপ ছিল, কিন্তু সেই আক্ষেপ এবার মিটল।’
২০১৯ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে বলে দাবি করেছেন অর্জুন।
Advertisement
তাঁর অভিযোগ, গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়ার পর থেকেই কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল তাঁকে। তাঁর কথায়, ‘আমার নামে ২৫৬টি মামলা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যেন ২৪ ঘণ্টা আমার উপর নজরদারি চলছে। মামলা সামলাতে সামলাতে হাপিয়ে উঠেছিলাম।’শুধু আইনি লড়াই নয়, রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি এবং হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। অর্জুনের কথায়, ‘অনেকবার প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছি। আমার বাড়িতে বোমাও পড়েছে।
Advertisement
কিন্তু আমি কখনও পিছিয়ে যাইনি।’ সেই কারণেই সরকার পরিবর্তনের পর তাঁকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের রাজনীতিতে অর্জুন সিং দীর্ঘদিন ধরেই এক প্রভাবশালী নাম। ২০০১ সালে ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রথমবার তৃণমূলের টিকিটে বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০০৬, ২০১১ এবং ২০১৬ সালেও একই কেন্দ্র থেকে টানা জয়লাভ করে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য আরও মজবুত করেন অর্জুন।
ভাটপাড়া থেকে শুরু করে গোটা ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জেলার রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক শক্তি হলেন অর্জুন সিং।তৃণমূলের উত্থানের সময় দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে কাজ করেছিলেন বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে সেই অবদানের বিনিময়ে বারবার বঞ্চনা ও হিংসার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর যে ধরনের হিংসা হয়েছিল, তা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব, কিন্তু তা হবে সম্পূর্ণ আইনি পদ্ধতিতে।’মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? প্রশ্নের জবাবে অর্জুন সিংয়ের উত্তর ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কথায়, ‘ফলনশীল গাছ সবসময় মাটির দিকে ঝুঁকে থাকে। ক্ষমতায় এলে অনেকেরই মাথা ঘুরে যায়। আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের বুঝিয়ে রাখা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং মানুষের জন্য কাজ করা।’
রাজ্যে তৃণমূলের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর দলের বহু নেতা-কর্মীর অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বিজেপির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন বলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। এই প্রসঙ্গে অর্জুন সিং স্পষ্টভাবে বলেন, ‘মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে আমাদের ভোট দিয়েছে। তাই তৃণমূল থেকে আসা নেতাদের দলে নেওয়া ঠিক হবে না বলেই আমার ব্যক্তিগত মতামত।’প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়েও তীব্র সমালোচনা শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। অর্জুন সিংয়ের অভিযোগ, ‘পুলিশকে সরাসরি রাজনীতিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
তৃণমূল দলটা পুলিশ ও গুন্ডাদের উপর নির্ভর করেই চলত। মানুষ সেই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’ তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন নবনিযুক্ত মন্ত্রী। তাঁর দাবি, পরাজয়ের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই দলের নেতাদের মধ্যে মতভেদ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ফলে আগামী দিনে দলটির অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দলবদল, মামলা-মোকদ্দমা এবং একাধিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে আসা অর্জুন সিংয়ের কাছে মন্ত্রিত্ব শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদ নয়, বরং দীর্ঘ লড়াইয়ের স্বীকৃতি বলেই মনে করছেন তাঁর অনুগামীরা। আর মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের মতে, বহু বছরের রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হল এই দায়িত্বপ্রাপ্তির মাধ্যমে।
Advertisement



