• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 10 June, 2026

সংশয় ও সম্ভাবনা

কোয়াড নিজেকে শুধু একটি কূটনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে— যেখানে ছোট ও মাঝারি দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কোনও চাপ বা ভয় ছাড়াই

দিল্লিতে কোয়াডভুক্ত চার দেশের— আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া— বিদেশমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হল, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বৈঠক শেষে একধরনের আশ্বাসের সুর শোনা গেল— বিশেষত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এখনও এই অঞ্চলে সক্রিয় ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালেই রয়ে গেল কিছু প্রশ্ন, কিছু সংশয়।
কোয়াডের জন্ম বা পুনর্জাগরণ কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। ২০১৭ সালের শেষ দিকে এই চারটি গণতান্ত্রিক দেশ একত্রিত হয় মূলত চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের মোকাবিলায়। দক্ষিণ চিন সাগর থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিকের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বেইজিংয়ের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন অনেক দেশকেই উদ্বিগ্ন করেছে। ফলে কোয়াড নিজেকে শুধু একটি কূটনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে— যেখানে ছোট ও মাঝারি দেশগুলি নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কোনও চাপ বা ভয় ছাড়াই।
এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিক এনার্জি সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের ফলে জ্বালানি সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। জ্বালানি মজুত তৈরি করা, বিকল্প উৎস খোঁজা এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা— এই সবকিছুর মাধ্যমে কোয়াড একটি বাস্তবমুখী বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজনে কার্যকর উদ্যোগও নিতে সক্ষম।
তবে শুধু জ্বালানি নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও কোয়াড তাদের কাজ বিস্তৃত করতে চাইছে। সামুদ্রিক নজরদারি ও নিরাপত্তা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিশ্চিত করা, এমনকি ফিজির মতো ছোট দেশে বন্দর পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রকল্প— এসবই প্রমাণ করে যে, এই জোট ধীরে ধীরে একটি বহুমাত্রিক সহযোগিতা কাঠামোয় পরিণত হচ্ছে। এর ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলির সামনে নতুন বিকল্প তৈরি হতে পারে, যা তাদের একতরফা নির্ভরতার বাইরে এনে আরও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করবে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়— এই জোট কতটা সুসংহত? বিশেষ করে আমেরিকার নীতিগত অবস্থান নিয়ে কিছু দ্বিধা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে চিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে যে ওঠানামা দেখা গিয়েছে, তা এখনও অনেকের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। আমেরিকা একদিকে চিনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, অন্যদিকে আবার সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের কথাও বলে— এই দ্বিমুখী বার্তা কোয়াডের অংশীদারদের কিছুটা সতর্ক করে তুলেছে।
এছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল— কোয়াড এখনও পর্যন্ত নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করতে পারেনি।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের মাটিতে একটি নেতৃবৃন্দের বৈঠক আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সমস্যাই নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছারও প্রতিফলন। যদি শীর্ষ পর্যায়ে ঐকমত্য না থাকে, তবে নিচের স্তরের উদ্যোগগুলি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।অতএব, কোয়াডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, তাদের ঘোষিত উদ্যোগগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। শুধু বিবৃতি বা পরিকল্পনা নয়, বাস্তবে কাজের ফলাফল দেখাতে পারলেই এই জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলি আজ এমন একটি শক্তির সন্ধানে, যারা তাদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাস্তব সহযোগিতা দিতে পারবে, কোনও প্রকার রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই।
কোয়াড এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা— একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য এবং কার্যকর আঞ্চলিক জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার। অন্যদিকে রয়েছে সংশয়— অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ও নীতিগত অস্পষ্টতা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই কোয়াডকে এগোতে হবে। যদি তারা তা করতে সক্ষম হয়, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির নতুন সমীকরণ তৈরি হতে বাধ্য।