• facebook
  • twitter
Saturday, 16 May, 2026

সরকারি নয়, বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাই ভরসা

সরাসরি অভিজ্ঞতা ১৯৭০ সালের পর থেকে যখন কলকাতায় মেডিক্যাল পড়তে আসা তখন লক্ষণীয় বিষয় হল, সেই সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা খুবই উন্নত ছিল।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

বাসুদেব দত্ত

সত্যজিৎ রায়ের গুপি গায়েন বাঘা বায়েন ছবিতে একটি গান ছিল— ‘কত রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাই রে…’ এই গানটি পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরের টাইটেল সং বলা যেতে পারে।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সূচনা ব্রিটিশ আমলে সামরিক হাসপাতাল দিয়ে হলেও, ১৮৩৫ সালে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও উনিশ শতকের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের মাধ্যমে এর ভিত্তি গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে, একটি বিস্তৃত সরকারি স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। উনিশশো শতাব্দীর প্রথমার্ধে কলেরা, প্লেগ ও গুটিবসন্ত মহামারি রূপে দেখা দিলে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় ও জনস্বাস্থ্য চিন্তার বিকাশ ঘটে। স্যানিটেশন, টীকাকরণ ও পৌর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সূত্রপাত হয়। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরবর্তীতে স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের ভূমিকা এবং দায়িত্ব সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করে। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রীসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন ডা. অনাথবন্ধু রায়। তাঁর আমলে জেলা হাসপাতালের ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাঠামোর উন্নতি পরিলক্ষিত হয়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী একজন দক্ষ অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারকে স্বাস্থ্য অধিকর্তা নিয়োগ করেন। গোড়া থেকেই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সহজলভ্য ছিল।

Advertisement

এই প্রতিবেদকের সরাসরি অভিজ্ঞতা ১৯৭০ সালের পর থেকে যখন কলকাতায় মেডিক্যাল পড়তে আসা তখন লক্ষণীয় বিষয় হল, সেই সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা খুবই উন্নত ছিল। শিক্ষার মান, শিক্ষকদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি ও কৌশল বিশ্বমানের ছিল। তাঁরা আজ প্রায় কেউই হয়ত বেঁচে নেই, তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন বিশ্বসেরা শিক্ষক। বেশিরভাগ শিক্ষক ছিলেন কলকাতার তথা দেশের সেরা চিকিৎসকদের অন্যতম। সারা ভারত থেকে রোগী আসত কলকাতায়। দক্ষিণ ভারতে পাড়ি দেওয়ার প্রবনতা একেবারেই ছিল না। কলকাতার ডাক্তার ও ডাক্তারিটা সত্যিই ছিল খুব উন্নতমানের।

ডাক্তারবাবুদের আন্দোলন তেমনভাবে চোখে পড়েনি। ১৯৭৪ সালে সিএসি বা সেন্ট্রাল একশান কমিটির আন্দোলনের কথা মনে আছে, সবকটি মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা আন্দোলনে নেমেছিল ভাতা বৃদ্ধি, ২৪ ঘন্টা ডাক্তারি পরিষেবা— যেমন ব্লাড ব্যাঙ্ক, ফার্মেসি ও ল্যাবরেটরি খোলা রাখার আর্জির দাবিতে। তার সঙ্গে ছিল হাসপাতালে হামলাবাজী রোধে ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের মাথায় আইএএসের পরিবর্তে চিকিৎসক নিয়োগের জোরালো দাবি। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সামান্য ভাতা বৃদ্ধি (১০০-১৫০টাকা) স্বাস্থ্য অধিকর্তার পদ এক্স অফিসিও সেক্রেটারি (পদাধিকার বলে) বা সেক্রেটারির সমতুল্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল কিন্তু কোনও ক্ষমতা ছিল না। এখন আর সেটা নেই বা নামের পাশে লেখা হয় না। ১৯৭৭ সালে সরকার পরিবর্তন হলে আরএসপির ননী ভট্টাচার্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন। কিছুদিন চলার পর সিপিএম আরএসপির হাত থেকে দপ্তর কেড়ে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে নেয়। দু’জনকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করা হয় ডা. অম্বরীষ মুখার্জি মেডিক্যাল কলেজ ও শহরের এবং রামনারায়ণ গোস্বামী মফস্বলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভার নেন। কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া আর কিছুই হয়নি। দাপুটে দুর্মূখ প্রশান্ত শূরকে স্বাস্থ্যদপ্তরের দায়িত্বে এনেও কোনও লাভ হয়নি। এরপর ডা. সূর্যকান্ত মিশ্রকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে বসানো হয়েছিল। সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। শিক্ষক অধ্যাপক পার্থ দে কিছুদিন ছিলেন। বিকেলে পেয়িং আউটডোর ১০০ টাকার বিনিময়ে চালু হয়েও, ডাক্তারের অসহযোগিতায় বন্ধ হয়ে যায়। রেফার করা রোগীর হয়রানি কমাতে আইভিআরএস প্রযুক্তির মাধ্যমে কোথায় বেড খালি আছে জেনে, সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা শুরু হয়ে অচিরেই বন্ধ হয়েছিল।

পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের বিদায়ের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, স্বাস্থ্যদপ্তর বেহাল৷ তাই তিনি দীর্ঘ পনের বছর হাল হাতে নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে গ্যাঁট হয়ে বসে ছিলেন। স্বাস্থ্যদপ্তরের যাবতীয় কার্যকলাপের মধ্যে পার্টির প্রভাব কায়েম হয়েছে। অভয়াকাণ্ডের মত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, অবস্থা আরও খারাপের দিকে গেছে। প্রচুর টাকা খরচ করে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের নাম করে বিল্ডিং বেড়েছে, কিছু দামী যন্ত্রপাতি কিনে অকেজো করে ফেলে রাখা হয়েছে। কাটমানির খেলা চলেছে। কলকাতায় প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে ভিড় দেখলেই বোঝা যায় সরকারি হাসপাতালের ওপর জনগণের আস্থা নেই। ‘স্বাস্থ্যসাথী’র নাম করে অনেক টাকা প্রিমিয়াম বাবদ দিতে হলেও গরিবদের কোনও সুবিধা হয়নি। কেবল পার্টির নেতাদের সুপারিশ নিয়ে কিছু লোক সুবিধা নিয়েছে। যে সমস্ত অপারেশন কেসে বিলের পরিমাণ বেশি শুধু সেগুলো ‘স্বাস্থ্যসাথী’ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে নার্সিংহোম মালিকের। বেশি লাভ নেই, তাই মেডিক্যাল কেস নেওয়া হয় না। বলা হয় বেড় নেই। অবশ্য কিছু নগদ টাকা বেশি দিলে কোথাও কোথাও ভর্তি করা হয়। সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। সরকারি হাসপাতালের রেফার রোগ ঠেকাতে বিস্তর গবেষণা চলছে। অবস্থা সেই তিমিরেই আছে। দক্ষিণ ভারতে যাওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।

বাম আমলে প্রয়াত রাজ্যপাল নুরুল হাসান, অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত, অভিনেতা উৎপল দত্ত-সহ বেশ কিছু ভিআইপি পিজি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, কিন্তু তারপর রাজ্যের মন্ত্রীরা বাইপাসের ধারে পাঁচতারা হসপিটালে ভর্তি হন। সরকারি হাসপাতালে নৈব নৈব চ। আমাদের ছাত্রাবস্থায় বা সরকারি চাকরির প্রথম জীবনে, ডাক্তারদের সংগঠন ছিল অরাজনৈতিক, পরবর্তীতে ডাক্তাররা ধর্মঘট করলে সামাল দিতে সরকারকে নাজেহাল হতে হয়। বামফ্রন্ট সরকার ধর্মঘট ভাঙতে তাদের অনুগত ডাক্তারদের নিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অম্বরীষ মুখার্জির নেতৃত্বে মৌলালীর যুবকেন্দ্রে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে কতিপয় পার্টির বশংবদ ডাক্তারদের নিয়ে নতুন সংগঠন ‘​অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস’ গঠন করে৷ ভালো পোস্টিংয়ের লোভ অথবা বদলির ভয় দেখিয়ে প্রায় ৯৯ শতাংশ ডাক্তারদের তাদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করে। ফলে চিরাচরিত বদলি নীতি কার্যত বাতিল হয়ে যায়। সরকার সুবিধাভোগীদের পুরোপুরি আয়ত্ত্বে এনে আর কোনও ডাক্তার-আন্দোলন দানা বাঁধতে দেয়নি। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ব্যবস্থা সফল হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়, সিপিএমের দেখানো পথেই প্রায় সব ডাক্তারদের তৃণমূল প্রভাবিত ‘প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের’ সদস্যভুক্তি করাতে সক্ষম হয়। ডাক্তারেরা নিজ নিজ এলাকায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়েই ব্যস্ত থাকে। কেউ কেউ উপরি পাওনা হিসেবে বাড়তি নন-প্র্যাকটটিসিং অ্যালাওয়েন্স ভোগ করার সুবিধা নিয়ে থাকেন, কারণ কোনও শাস্তির বালাই নেই, রোজ ডিউটি যেতে হয় না, সপ্তাহে তিন- চারদিন গেলেই হয়। কোনও তদারকির ব্যবস্থা নেই।

হাসপাতালে দালালচক্র নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। সাধারণত স্থানীয় রাজনৈতিক দাদাদের প্রচ্ছন্ন মদতে দালালচক্র বেড়ে ওঠে। দালালচক্র সব দলের আমলেই ছিল এবং থাকবে। জোগান চাহিদার ফারাক, বেকারত্ব এবং একশ্রেণীর অফিসারদের দুর্নীতি মূলত দায়ী। মফস্বলের হাসপাতালে ওষুধের দোকান ও ল্যাবরেটরির প্রতিনিধিদের ডাক্তারদের সঙ্গে রাউন্ড দিতে দেখা যায়। হাসপাতালের সুপারিটেনডেন্টরা না দেখার ভান করেন। ভুক্তভোগীরা এসব জানেন। স্বাস্থ্য দপ্তরের দূর্নীতিমুক্তকরন খুব কঠিন কাজ। সরকারের ব্যাপারটা ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। এ ব্যাপারে কেরল বা তামিলনাড়ু মডেলের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
তবে সবার আগে প্রয়োজন হাসপাতালে হামলাবাজি বন্ধ ও অবাঞ্ছিত ব্যাক্তিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ। প্রয়োজনে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্য নেওয়া জরুরি। হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে সেটা নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা, মেইল আইডি, টোলফ্রি নম্বর ইত্যাদি প্রকাশ্য স্থানে বড় করে লেখা থাকা উচিত।

Advertisement