• facebook
  • twitter
Saturday, 25 April, 2026

নেতা নয় সেবক হয়ে থাকবো, জোড়াসাঁকোতে আশ্বাস বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝার

‘যা যা করণীয় কাজ আছে, সব করব। সব সময় আমাকে পাবেন মানুষ। আমি ময়দানে থেকে কাজ করি। আমি শাসক নই, সেবক।’

নিজস্ব চিত্র

এবারের নির্বাচনে শহর কলকাতার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জোড়াসাঁকো। বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রটি এখন কার্যত পরিণত হয়েছে হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে। কারণ, এখানে লড়াইটা শুধুমাত্র তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, এখানে মুখোমুখি দুই ‘বিজয়’। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রার্থী হয়েছেন বিজয় উপাধ্যায়। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিজেপির হয়ে ময়দানে নেমেছেন বিজয় ওঝা। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় দুজনেই পরিপক্ব। সংগঠন এবং মাঠের রাজনীতিতে দুজনেই সিদ্ধহস্ত। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, দুজনেই কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর এবং দুজনেই অবাঙালি।

জোড়াসাঁকো এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, পুরনো উত্তর কলকাতার সংস্কৃতি এবং বহুভাষিক জনসংখ্যার এক অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। ২০১১ সাল থেকে টানা তিনবার এই কেন্দ্র দখলে রেখেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ফলে সংগঠনগতভাবে এই এলাকায় তাদের ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত। তবে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে পরিবর্তন। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও হিন্দিভাষী ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিজেপির প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পরিবর্তনই এবারের নির্বাচনে জোড়াসাঁকোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সেই জায়গা থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস এমন এক প্রার্থীকে সামনে এনেছে, যিনি স্থানীয় স্তরে গ্রহণযোগ্য এবং সংগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অন্যদিকে বিজেপিও একই কৌশল নিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, কাউন্সিলর হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা, এই সবকিছুকে সামনে রেখেই তারা ভরসা রেখেছে বিজয় ওঝার উপর।

Advertisement

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রচারের গতি এবং তীব্রতা। সকাল থেকে রাত, প্রচারে কোনও খামতি রাখতে নারাজ বিজেপি প্রার্থী বিজয় ওঝা। তিনি প্রচারে নেমে নিজেকে ‘নেতা’ নয়, ‘সেবক’ হিসেবেই তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বাড়ি বাড়ি পৌঁছনো, স্থানীয় সমস্যার কথা শোনা, এই সবকিছুকেই ওঝা তাঁর প্রচারের মূল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

Advertisement

বিজয় ওঝার বক্তব্য, মানুষের পাশে থাকা এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য। তাঁর কথায়, ‘যা যা করণীয় কাজ আছে, সব করব। সব সময় আমাকে পাবেন মানুষ। আমি ময়দানে থেকে কাজ করি। আমি শাসক নই, সেবক।’

কলকাতা পুরসভার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি দাবি করছেন, তাঁর কাজের ধরন সম্পর্কে স্থানীয় মানুষ যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি বিধানসভা স্তরে কাজে লাগাতে চান। তাঁর আরও দাবি, ‘২৩ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষ জানেন আমি কীভাবে কাজ করি। জোড়াসাঁকোর মানুষকেও সেই একই আশ্বাস দিচ্ছি। সব সময় পাশে থাকব। এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হবে না, যেখানে বিধায়ককে খুঁজে বের করতে হবে।’

এদিকে উত্তর কলকাতার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই কেন্দ্রের নির্বাচনী লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে। জোড়াসাঁকো, চৌরঙ্গি, এন্টালি, বেলেঘাটা, শ্যামপুকুর, মানিকতলা এবং কাশীপুর-বেলগাছিয়া, এই সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র মিলিয়ে উত্তর কলকাতায় বিপুল সংখ্যক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্রায় ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৪১ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
এই প্রসঙ্গে এবং এসআইআর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিজয় ওঝা জানান, অতীতে ভোট প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম দেখা গিয়েছে। ছাপ্পাবাজি, ভুয়ো ভোটার, জোড়খাটানো, সবই ঘটেছে বলে দাবি তাঁর। তাঁর মতে, ‘যদি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন হয়, তাহলে প্রকৃত জনমত সামনে আসবে। ফলাফলই বলে দেবে মানুষ কাকে সমর্থন করছে।’

তৃণমূল প্রার্থী বিজয় উপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কতটা কঠিন? প্রশ্নের উত্তরে ওঝা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই লড়াই ব্যক্তিগত নয়, আদর্শের। তাঁর বক্তব্য, ‘এটা কোনও নামের লড়াই নয়, এটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই। চুরি, কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে লড়াই হবে। এখানে সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াই।’ রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি যথেষ্ট আক্রমণাত্মক সুরে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এবারের নির্বাচন শুধুমাত্র সরকার গঠনের লড়াই নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ‘হারানো গৌরব’ ফিরিয়ে আনার লড়াই। তিনি বলেন, ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকারই পারে রাজ্যকে নতুন দিশা দেখাতে। ভারতীয় জনতা পার্টি লড়ছে জেতার জন্যই।’ দুই প্রার্থীই অবাঙালি হলেও, বাঙালির মন জয় করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। আর সেই লড়াইয়ে কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে জোড়াসাঁকোর ভোটাররাই।

Advertisement