ভারতের উন্নয়নের আলোচনায় শিক্ষা এবং তথ্য— এই দুই স্তম্ভকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই দুইয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। দেশের যে শিক্ষকদের হাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে ওঠার কথা, তাঁদেরই ক্রমাগত টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও তথ্যসংগ্রহের কাজে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এভাবে কি সত্যিই দেশের তথ্যে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব, নাকি এতে শিক্ষা এবং তথ্য— উভয় ক্ষেত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
বর্তমানে জনগণনা-২০২৭-এর প্রস্তুতি, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ তালিকা সংশোধন, স্বাস্থ্যবিমার জন্য উপভোক্তা নথিভুক্তকরণ, এমনকি গবাদিপশুর গণনাতেও শিক্ষকদের নিযুক্ত করা হচ্ছে। এই চিত্র নতুন নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ একই সময়ে ‘সমগ্র শিক্ষা অভিযান’-এর আওতায় পরিচালিত স্কুলগুলিতে প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষক পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ, যেখানে শিক্ষকতার ঘাটতি প্রকট, সেখানে বিদ্যমান শিক্ষকদেরও শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানের উপর। প্রতিদিন একজন শিক্ষক যখন বিদ্যালয়ের বাইরে অন্য কাজে নিয়োজিত থাকেন, তখন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি দিন কার্যত নষ্ট হয়ে যায়। এটি কোনো এককালীন সমস্যা নয়— বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে এই বিঘ্ন ঘটতে থাকে। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায় এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের উপর।
দ্বিতীয়ত, এই ধরনের কাজের জন্য শিক্ষকদের ব্যবহার করা হলেও, তথ্যের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। তথ্য সংগ্রহ একটি বিশেষায়িত দক্ষতা, যা প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। অথচ যাঁরা এই কাজ করছেন, তাঁদের মূল পেশা শিক্ষা প্রদান। ফলে অনিচ্ছা, ক্লান্তি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব— এই সব মিলিয়ে তথ্যের নির্ভুলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর ফলে যে তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়, তা নীতিনির্ধারণের জন্য কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে— তাহলে কি বিকল্প নেই? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, অবশ্যই আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে একটি স্থায়ী জনগণনা সংস্থা রয়েছে, যেখানে পূর্ণকালীন কর্মীরা সারা বছর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ করেন। প্রয়োজনে বড় আকারের গণনার সময় অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা হয়। ফলে তথ্যের মান যেমন উন্নত হয়, তেমনই শিক্ষাব্যবস্থাও অক্ষত থাকে।
ভারতের ক্ষেত্রেও একটি পৃথক ‘ইন্ডিয়ান এনুমারেশন সার্ভিস’ গঠন করার প্রস্তাব নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। এই ধরনের একটি পরিষেবা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে স্থায়ী কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মী থাকবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার ছাত্রছাত্রীদের এই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। দেশে প্রায় চার কোটির বেশি উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী রয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকেই প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং এই ধরনের কাজে আগ্রহী হতে পারে। এতে একদিকে যেমন তরুণদের জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে তথ্য সংগ্রহের কাজও আরও গতিশীল ও কার্যকর হবে।
বর্তমানে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে— তীব্র গরমে শিক্ষকরা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নিজেদের ব্যক্তিগত স্মার্টফোনে জটিল অ্যাপ ব্যবহার করে তথ্য আপলোড করছেন— তা একবিংশ শতাব্দীর একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আদৌ কাঙ্ক্ষিত নয়। এর পরিবর্তে যদি প্রশিক্ষিত, প্রযুক্তি-সচেতন এবং আগ্রহী একটি দল এই কাজ করে, তাহলে তথ্য সংগ্রহ অনেক বেশি নির্ভুল, সময়োপযোগী এবং ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে, শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আমরা একদিকে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করছি, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত মানের তথ্যও পাচ্ছি না। এই দ্বৈত ক্ষতির পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি সুসংগঠিত, পেশাদার এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে এগোতে হবে। কারণ, একটি দেশের ভবিষ্যৎ যেমন তার শিক্ষার উপর নির্ভর করে, তেমনই সঠিক তথ্যের উপরও নির্ভর করে তার উন্নয়নের দিশা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Advertisement