শোভনলাল চক্রবর্তী
সংবাদে প্রকাশ যে, রাতেই নাম তোলার ‘টোপ’ দিয়ে মালদহের মোথাবাড়িতে জড়ো করা হয়েছিল ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়া এলাকাবাসীকে, যার জেরে, দীর্ঘক্ষণ কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসে আটকে পড়েন ভোটার তালিকায় ‘বিবেচনাধীনদের’ নাম নিষ্পত্তিতে ব্যস্ত বিচারকেরা। গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের কার্যত ঘেরাও করে রাখা হয়। উদ্ধারে যাওয়া কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করা হয়। কীভাবে পাকল সমস্যা? এলাকার একাধিক বাসিন্দার দাবি, সমাজমাধ্যমের সূত্রে স্থানীয় ভাবে ছড়িয়ে পড়ে ‘অডিও ক্লিপ’, যাতে বলা হয়েছিল, নাম নিষ্পত্তির কাজে আসা বিচারকেরা কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসে রয়েছেন। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এবং প্রাথমিক অতিরিক্ত তালিকা অনুযায়ী, যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, যত রাত হোক তাঁদের নাম তোলানো হবে। যাঁরা ব্লক অফিসে আসবেন না, তাঁদের নিজেদের সমস্যা নিজেদের মতো করে বুঝে নিতে হবে। নাম তোলার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবে বলে গ্রামের মানুষকে বোঝানো হয়েছিল। তাই নথিপত্র নিয়ে শিশু কোলে বহু মহিলা, এলাকার বাসিন্দারা ব্লক অফিসে জড়ো হন। প্রথমে কে দিয়েছিল সে বার্তা? এলাকার কয়েকজন মহিলার বয়ানে জানা গিয়েছে যে, তাঁদের বলা হয়েছিল, রাতে ব্লক অফিসে গেলে নাম উঠবে। তাই তাঁরা নথি নিয়ে গিয়েছিলেন। কেউ সকাল থেকে, কেউ বিকেল থেকে হত্যে দিয়ে বসেছিলেন। কে এ সব বলেছিল?
Advertisement
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে টিভিতে দেখা গেল মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে মহিলারা বললেন যে, সকলেই বলেছিল। এলাকাবাসীর দাবি, ওই ‘অডিও ক্লিপ’ তাঁদের কাছে নেই। ঘটনার এনআইএ-তদন্ত শুরু হতে আতঙ্কে তাঁরা তা ফোন থেকে ‘ডিলিট’ করে দিয়েছেন। মোথাবাড়ি বিধানসভায় ‘বিবেচনাধীনের’ তালিকায় রয়েছেন ৭৯,৬৮২ জন। প্রশাসন সূত্রের খবর, তার মধ্যে একটা বড় অংশ ইতিমধ্যে বাদ পড়েছেন। ওই এলাকার রথবাড়ি পঞ্চায়েতের তৃণমূলের প্রধান বলেন যে, তিনি স্থানীয় ভাবে খবর পান, ব্লক অফিস থেকে ডাকা হচ্ছে। সে রাতেই যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম তালিকায় তোলা হবে। প্রধান এবং বিএলওদের থাকতে হবে। এ কথা শুনে তিনি বিডিও-কে ফোন করেন। তিনি জানান, ফোনে বিডিও তাঁকে বলেন যে, আপনি এ কথা বিশ্বাস করলে, সাধারণ মানুষ কী করবে? তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে, কেউ ভুল বোঝাচ্ছে।
Advertisement
তিনি সেই মুহূর্তে কয়েক জন বিএলওকে ব্লক অফিসে যেতে নিষেধ করেন। তবে ব্লক অফিসের বাইরে জমায়েত হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা যখন বিচারকদের উদ্ধার করেন, তখন তাঁদের গাড়ি ধাওয়া করা হয়। রাস্তায় বাঁশ ফেলে আটকানোর চেষ্টা, ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়। সে ঘটনার পরে বিচারকেরা নথি পরীক্ষা করতে আর কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসে যাননি। মালদহ শহরের একটি হোটেলে সে কাজ করছেন। হোটেলের সামনে ২৪ ঘণ্টা পাহারায় বাহিনীর জওয়ানেরা। বিডিও, কালিয়াচক-২ ফোন ধরেননি। জবাব মেলেনি মোবাইল-বার্তার। তৃণমূলের কালিয়াচক ব্লক সভাপতি বলেন যে, মানুষকে ভুল বুঝিয়েই ঘেরাও করানো হয়েছে। অডিও-বার্তায় বলা হয়েছে ব্লক অফিসে না গেলে ভোটার তালিকায় নাম উঠবে না। মানুষ সে কথা বিশ্বাস করেই দলে-দলে ভিড় করেছেন। তাঁদের বিশ্বাসের পিছনে এমআইএমের মতো কিছু দল রয়েছে। তবে এমআইএমের অন্যতম জেলা-নেতা জানিয়েছেন যে, মানুষকে ভুল বোঝানো হয়েছে এ কথা সত্যি। তবে এ সবের পিছনে শাসকদলের লোকজনই রয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। অতএব ধোঁয়াশা রয়েছে।
নির্বাচন সমাগত, এই মুহূর্তে রাজ্যের অধিকাংশ প্রশাসনিক উচ্চপদেই যেহেতু নির্বাচন কমিশন দ্বারা সদ্য-নিযুক্ত নতুন ব্যক্তিরা অধিষ্ঠিত, ফলত পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন স্বভাবোচিতভাবেই নিজের দায় স্বীকার করতে নারাজ। স্পষ্টতই, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ফলে এসআইআরের কাজ করতে গিয়ে বিচারকরা বিপদে পড়লে কমিশন অবশ্যই দায় এড়াতে পারে না— তাদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে, শেষ অবধি বিষয়টি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, তাই রাজ্য সরকারের সতর্কতাও বাঞ্ছনীয়। এই অতীব বিপজ্জনক হিংসা-তাণ্ডব কিন্তু সমগ্র রাজ্যেরই স্বার্থবিরোধী হয়ে উঠতে পারত, নির্বাচনের ঠিক আগে জনক্রোধের এ হেন প্রকাশ গোটা রাজ্যকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারত। সংখ্যালঘু-সম্প্রদায় অধ্যুষিত এই অঞ্চলটিতে এবার এসআইআর চলাকালীন ক্ষোভ-প্রতিবাদ সঙ্গতভাবেই এত গভীর ও ব্যাপক যে, যে কোনও মুহূর্তে বৃহত্তর অশান্তির সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সব দিক বিচার করে রাজ্যের নাগরিক সমাজের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনী নিজের কাজ সুষ্ঠুভাবে করুক, নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতি শান্ত ও উপদ্রববিহীন রাখার প্রয়াস করুক, রাজ্য প্রশাসনও মনে রাখুক যে প্রাক-নির্বাচনী সময়ের গুরু দায়িত্ব থেকে এক চুলও স্খলন চলতে পারে না। প্রত্যেকের সম্মেলক দায়— রাজ্যবাসীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখা।
অবশ্যই, দায় ও দায়িত্বের প্রশ্নে রাজ্যবাসীর স্বার্থের কথাটিও উঠে আসে। কালিয়াচকের উত্তেজনা গোটা রাজ্যের পক্ষেই বিপদবার্তা, তার সঙ্গে ভোটার অধিকার বাতিল হওয়া মানুষের গভীর বিপদের বিষয়টিও বিতর্কোর্ধ্ব। তালিকা থেকে বাদ-পড়া অগণিত সাধারণ মানুষ এখন অত্যন্ত অসহায় ও নিরাপত্তারহিত বোধ করছেন। কেন তাঁরা অধিকার হারালেন, কোন পথে প্রতিকার সম্ভব, কিছুই জানা নেই, এবং নির্বাচন কমিশন এ সব প্রশ্নের উত্তরদানে নারাজ। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক স্বার্থসন্ধানীরা সুযোগ নিতে ব্যগ্র। মানুষের এই পরিব্যপ্ত অসহায়তার কথা মাথায় রেখে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আরও একটি জরুরি দাবি— নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে দায়িত্বশীলভাবে এবং মানবিক ভাবে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করতে হবে। এ বারের রাজ্য বিধানসভা ভোটের অতি-ঘটনাবহুল সময়েও কালিয়াচক একটি বিশেষ উদ্বেগের মুহূর্ত হয়ে রইল। ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচারবিভাগের সুরক্ষা একটি অতি সংবেদনশীল বিষয়। পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন কি এই গোড়ার কথা বিস্মৃত হয়েছিল? হলে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক— বিশেষত যখন পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ার ষাট লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের বিষয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভার বিচারবিভাগের কর্তাদের উপর ন্যস্ত করার সময়ে সর্বোচ্চ আদালত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল যে, কর্তব্যরত বিচারকদের সুরক্ষার জরুরি দায়িত্বটি রাজ্য প্রশাসনকে নিতেই হবে। তা সত্ত্বেও কীভাবে মালদহের কালিয়াচকে গত বুধবার এমন ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটলো, যেখানে টানা নয় ঘণ্টা বিডিও অফিসে এসআইআরের কাজে নিযুক্ত সাত পুরুষ-মহিলা বিচারককে আটকে রাখা হল, এবং গভীর রাতে তাঁরা বার হওয়ার সময়ও গাড়ির উপর আক্রমণ চলল? অমার্জনীয় এবং কঠোর শাস্তিযোগ্য এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা শোনা গিয়েছে, বেশ কিছু প্রশাসনিক আধিকারিকের উপর শো-কজ নির্দেশ আরোপিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে এখন তদন্তের ভার, সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে। এই আক্রমণ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের উপর ঘটেছে, কেবল সেটুকুই তো নয়। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশক্রমে তাঁরা কাজ করছিলেন— ফলত আক্রমণের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, অন্তত দুটি তত্ত্ব উঠে আসছে এক্ষেত্রে। প্রথম, ভুল বুঝিয়ে কেউ বা কারা অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে জড়ো করেছিলেন, দ্বিতীয়, গোটা ঘটনাটি যেন বিচার বিভাগের উপর আক্রমণ, এবং সেই কারণে সর্বোচ্চ আদালতের রাজ্যে সরকারি আমলাদের ভৎর্সনা। কিন্তু এর বাইরে একটা তৃতীয় অভিমুখ গোটা ঘটনায় থাকতে পারে, এবং সেটি হল, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সেক্ষেত্রে, এই ধরনের জমায়েত ও উত্তেজনার ঘটনা এই প্রথম তা একেবারেই নয়। যে ভাবে সাধারণ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে,তাতে এই ধরনের প্রতিবাদ অন্যত্রও হতে পারে, এটা ভুলে গেলে চলবে না। সে ক্ষেত্রে গোটা ঘটনা হাতের বাইরে চলে যাওয়ার আগে, স্থানীয় প্রশাসনকে অনেক বেশি তৎপর থাকতে হবে। এই রাজ্যে ভোট পূর্ববর্তী শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
Advertisement



