• facebook
  • twitter
Friday, 17 April, 2026

বাংলা নববর্ষ: বাঙালির চেতনার ঐতিহ্য

স্বাধীন ভারত ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পঞ্জিকা-রাজ্যের নৈরাজ্য দূরীকরণের জন্য ‘ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি’ গঠন করেন।

সুস্মিতা মুখার্জী চট্টোপাধ্যায়

কর্মজীবনের ব্যস্ততায় প্রকৃতির পরিবর্তন আমাদের নজরেই আসে না। শহুরে মানুষ আমরা খেয়ালই করি না কখন চুপিসাড়ে কৃষ্ণচূড়ায় লাল রং ধরতে শুরু করে,কখন চাতক-চাতকী জল চেয়ে ডাকতে থাকে আকাশে- বাতাসে, কখন মাঠের মাটিতে টান ধরে, কখন ফুলে ফুলে মৌমাছিদের আনাগোনা বাড়ছে আবার কখন আমগাছের ডালে কচি আমের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। আসলে পয়লা বৈশাখ আসার আগে চৈত্র সেল, নানা ফ্যাশন ব্র্যান্ড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা হোটেল-রিসর্টের চটকদার বিজ্ঞাপন না এলে বোধহয় আমাদের মনেই পড়ত না যে আবার বৈশাখ এসে গিয়েছে। তার কারণ হিসেবে বলতে পারি, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চৈত্র শেষে আকাশের রূপও যে বদলায় তার দিকে কি আমরা নজর রাখি? সূর্য ক্রমশ উত্তরায়ণের পথ ধরে। অথচ নগরীর কর্মব্যস্ততা আর আলোর ঝলকানিতে আমরা এসব খেয়াল করতে পারি না। তবুও বৈশাখ আসে, বৈশাখ যায়। এবারও এসেছে, আমরা না ডাকলেও সে আসবে। শুরু হলো আরেকটি বঙ্গাব্দের— ১৪৩৩।

Advertisement

বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন পয়লা বৈশাখ। বছরের প্রথম দিনটি বাঙালিরই শুধু নয়, বাংলাভাষী আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন-জগতে স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভ সূচনার দিন। জীর্ণ-পুরনোকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করে বাঙালি জাতি। তাই পয়লা বৈশাখ কেবল একটি তারিখ নয়, পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন।

Advertisement

পয়লা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। কলকাতা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী প্রতিটি বাঙালি দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে পালন করেন। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন উৎসব। বৈশাখে বর্ণিল উৎসবের সাজে সেদিন যেন সারা বাংলা মেতে উঠে। বৈশাখের প্রথম ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেয় নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। বাঙালির ঘরে ঘরে বর্ষবরণের নানা আয়োজন চলে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলা নববর্ষ পালন করে।‌ আসলে পয়লা বৈশাখকে বলতে পারি বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক যেন বাংলার নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষ।

১৯৬৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৯৬৭ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর ধরে প্রতি শনিবার যুগান্তরের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রাম বাংলার সংবাদ লিখতেন ‘গ্রামের চিঠি’ নামে। নববর্ষ নিয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের আটান্ন বছর আগের লেখা আবেগ আজও কত প্রাসঙ্গিক দেখুন—
‘বৈশাখ থেকে শুরু করে আকাশ বাতাস জল পৃথিবী যেন একদিনের নিত্যকর্ম করলেন। সূর্য তেজ দিয়ে মাটিকে শুষ্ক করলেন— জলকে টেনে উপরে তুললেন— বাতাসকে চঞ্চল করলেন, বাতাস ঝড় হল— জল মেঘ হল— পৃথিবীর উপর ঝরল— উত্তাপে— বায়ুর আনুকূল্যে বর্ষার সিঞ্চনে পৃথিবী জীবন পরিপূর্ণা হল, উদ্ভিদ নবপত্রোন্মুখ নূতন হল— নূতন ফুল ফোটালে; ফল ও ফসল ধরালে; পরিপক্ক হল, ঝরল। আবার নববর্ষে নূতন পর্যায়। ফল ফসলের বীজ গ্রীষ্ম-উত্তাপ পক্ক হয়ে বর্ষার বর্ষণ সুরু হতে অঙ্কুর ভেদ করে নবজীবনের মত দেখা দেবে।’

একসময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির সঙ্গে। কারণ, কৃষিকাজ ছিল তখন ঋতুনির্ভর।‌ পরে কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে মোগল সম্রাট আকবরের সময় বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তখন এ দেশে হিজরি সাল প্রচলিত ছিল। হিজরি বছরটি ঠিক রেখেই নতুন বর্ষপঞ্জি চালু হয়। বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রিস্টীয় সালের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরি সাল চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সাল ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরি সালে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে, আর ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। কিন্তু, বাংলা সনের দিন শুরু হয় ভোরে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। কাজেই সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাঙালির পয়লা বৈশাখের উৎসব। হিজরি চান্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় বাংলা সন। হিজরি সন চাঁদের পরিক্রমার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষিপণ্য ফলনের সময়ের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মোগল সম্রাট আকবর প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।

সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন এক নিয়ম করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে এই সন গণনা শুরু হয়। এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। এই ফসলি সন বাংলা ছাড়াও অন্যান্য প্রদেশে চালু হয় শাসকের ইচ্ছানুসারে। এই ফসলি সন আসলে সৌর ক্যালেন্ডার মেনে ঋতুভিত্তিক ফসল উৎপাদনের উপর কর আদায়ের ব্যবস্থা। তবে আকবরের তিরিশ চল্লিশ বছর আগে বাংলায় হুসেন শাহ ইসলামিক চান্দ্র বছর ও বাংলা সৌর বছরের তালমিলের চেষ্টা করেন। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ অনুধাবন করেছিলেন হিজরি চান্দ্র বছরের হিসাবে উৎসব অনুষ্ঠানের ঋতুকালীন বৈশিষ্ট্য বা তাৎপর্য বজায় থাকছে না। মূলত বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন, পরবর্তীকালে পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। জানেন কি, ১লা বৈশাখ নতুন বছরের সুচনাদিন হিসাবে পালিত হয় আসাম, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরাতেও।

গৌড়ের শাসক রাজা শশাঙ্কের আমলেই বাংলা সনের সূত্রপাত। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরে ৭০০ বা তার আগের বাংলা সনের উল্লেখ আছে। বাংলা সন প্রাচীন সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৈরি। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথিবীর একবার সূর্য প্রদক্ষিণে সময় লাগে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ দিন। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য প্রদক্ষিণে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন। অর্থাৎ বাংলা পঞ্জিকায় একবছর প্রকৃত একবছরের চেয়ে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬-৩৬৫.২৪২২=০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৫০.৪৩৮৪ সেকেন্ড এগিয়ে চলছে। বাংলা সন ওই প্রায় ২৪ মিনিট এগিয়ে থাকার ফলে প্রতি ৬০ বছরে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে একদিন বেড়ে যায়। রাজা শশাঙ্কর আমলে ১লা বৈশাখ হতো ২১ বা ২২ মার্চ। ২১ মার্চ দিনটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দিনটিকে বাসন্তী বিষুব বা মহাবিষুব বলে। ওইদিন সারা পৃথিবীতে দিনরাত্রি সমান সমান। ১২ ঘণ্টা দিন ১২ ঘণ্টা রাত। সূর্য ওইদিন ক্রান্তিবৃত্তের মহাবিষুব বিন্দুতে।

স্বাধীন ভারত ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পঞ্জিকা-রাজ্যের নৈরাজ্য দূরীকরণের জন্য ‘ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি’ গঠন করেন। বিশিষ্ট বাঙালী বিজ্ঞানী অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা ছিলেন ওই কমিটির সভাপতি। এই কমিটি প্রস্তাব করে ৪০০ বছরে ৯৭টি অধিবর্ষ (লিপইয়ার) গণনা করার। কমিটি প্রতিটি বাংলা মাসের দিন, সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র প্রত্যেকটি ৩১ দিন; আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন প্রত্যেকটি ৩০ দিন; চৈত্র মাস ৩০ দিন, অধিবর্ষে ৩১ দিন।

যাই হোক, পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। পয়লা বৈশাখের কথা বলতে গেলেই প্রথমে বলতে হয় হালখাতার কথা। অতীতে বাংলায় নববর্ষের মূল উৎসব ছিল এই হালখাতা, যা পুরোপুরি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

আমদের শৈশবের বৈশাখের আগমন সূচিত হতো বাজারে নতুন ফলের আমদানিতে। বাড়িতে তরমুজের আগমন জানান দিত গ্রীষ্মের আগমনের। তারপর তো আছে আম, লিচু, জাম, জামরুল, কাঁঠাল-সহ অন্যান্য ফল। এখন অবশ্য সব ফলই সারা বছর, সবসময় পাওয়া যায়। তাই মৌসুমী ফলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ততটা আর নেই।

আরও একটা ব্যাপার, পয়লা বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলা। এই মেলা যেন মানুষের মিলনমেলা, অনাবিল আনন্দের দিন। দই-চিঁড়ে, খই-মুড়কি পয়লা বৈশাখের আরেক অঙ্গ। কিন্তু আজকাল দেখি সমস্ত পাঁচ তারকা হোটেল বা রিসর্টে পয়লা বৈশাখের বাহারী খানাপিনা সমারোহ। মনে হয় যেন সবটাই আনুষ্ঠানিকতা, সবটাই সমাজমাধ্যমে নিজেদের জাহির করার উপলক্ষ্য।

আমার কেবলই মনে হয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মে যদি বাংলা নববর্ষ হারিয়ে যায়, তার বেশিরভাগ দায় কিন্তু আমাদের, এ দায় এড়ানোর উপায় আমাদের নেই। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানোর দিন হলো নববর্ষ। ‘হ্যারি পটার’-এর সঙ্গে ‘চাঁদের পাহাড়’ও পড়াতে হবে ওদের। মোদ্দাকথা বাঙালিয়ানার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। কেবল কাস্টার্ড নয়, দই-চিঁড়ে, কিম্বা মুড়কিও খেতে হবে। নববর্ষের ইঙ্গিতই হল বর্তমান সময়ের সমাপ্তি, নতুন সময়ের আরম্ভ— গতানুগতিকতায় তার জের টানা নয়। মানুষের মনে কত অনাগত ভাব ও ভাবনা ছুটে আসছে, কত নতুন আভাস ছড়িয়ে রয়েছে… তাতে তো সকলের শামিল হওয়া চাই। এই যে এক বছরকাল গত হল, তার প্রবাহ বেয়ে কোনও নতুন ভাব নক্ষত্রের আলোর মতো আমাদের জীবনে এসে জীবনজ্যোতিকে আরও সমৃদ্ধ এবং উজ্জ্বল করে তুলল— তাতে তো মিলতে হবে আমাদের, আর তবেই তো নতুন করে পাওয়া আমাদের নববর্ষকে।

Advertisement