কলকাতার বিধান ভবন, যা একসময় পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে মর্যাদার প্রতীক ছিল, সেখানেই বুধবার যে দৃশ্য দেখা গেল, তা নিঃসন্দেহে শুধু একটি দলীয় অশান্তির ঘটনা নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক। দলীয় প্রার্থীপদ নিয়ে বিবাদের জেরে কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে হাতাহাতি, ভাঙচুর, এমনকি ‘টিকিট বিক্রি’র অভিযোগ— সব মিলিয়ে এই ঘটনা একটি ঐতিহ্যবাহী জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থার নগ্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
ঘটনার সূত্রপাত বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। প্রয়াত সোমেন মিত্রর পুত্র রোহন মিত্রকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন দলেরই আরেক নেতা জায়েদ হোসেন। তাঁর অভিযোগ, প্রার্থীপদ নাকি অর্থের বিনিময়ে ‘বিক্রি’ হয়েছে। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার আগেই যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে, তা হলো— একটি রাজনৈতিক দল তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সামাল দিতে এতটাই অক্ষম হয়ে পড়েছে কেন?
Advertisement
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজ্যের বিধানসভায় কংগ্রেস কার্যত শূন্য। একসময় এই রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী দলটি আজ প্রান্তিক। এই পরিস্থিতিতে তাদের সামনে একমাত্র পথ ছিল, নীতিগত অবস্থানকে সুসংহত করা এবং মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন করা। বিশেষ করে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও দৃঢ় প্রচার চালিয়ে সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলার সুযোগ ছিল।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে, আসন্ন নির্বাচনে কংগ্রেস যদি দুই-একটি আসনও জিততে পারত, তবে সেটাই হতো তাদের পুনরুত্থানের সূচনা। কিন্তু বিধান ভবনের এই সংঘর্ষ সেই সম্ভাবনাকেই কার্যত ধূলিসাৎ করে দিল। ভোটারদের কাছে একটি দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সংগঠন এবং শৃঙ্খলা। সেখানে যদি প্রকাশ্যে মারামারি, ভাঙচুর, এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসে, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা কীভাবে ফিরে আসবে?
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। তা হলো, দলীয় নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট। যখন একজন নেতা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে প্রার্থীপদ বিক্রি হয়েছে, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং তা গোটা সংগঠনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। এই ধরনের অভিযোগের দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ দলীয় তদন্ত হওয়া জরুরি। নইলে এই অভিযোগই পরবর্তীকালে দলের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠবে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে যুব নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও। কাশিফ রেজার নেতৃত্বে আরেকটি গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ দেখিয়ে দিচ্ছে যে দলের ভেতরে মতপার্থক্য শুধু নীতিগত নয়, তা ক্রমশ ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে পরিণত হচ্ছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে কংগ্রেসের পক্ষে সংগঠনকে পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রাজনীতিতে মতভেদ থাকবেই, প্রার্থীপদ নিয়ে প্রতিযোগিতাও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতভেদ যদি প্রকাশ্যে হিংসাত্মক রূপ নেয়, তবে তা শুধু দলের ক্ষতি করে না, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেও আঘাত করে। একটি জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা সম্পূর্ণ বেমানান।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কংগ্রেস কি এই পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করছে? তারা কি বুঝতে পারছে যে, এই আত্মঘাতী সংঘাত তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকার করে তুলছে? নাকি এই ঘটনাও অন্যান্য অনেক ঘটনার মতোই সময়ের সঙ্গে বিস্মৃত হবে, আর দল একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে?
সময় এখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। কংগ্রেস যদি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, তবে প্রথমেই তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক করতে হবে এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক বার্তা দিতে হবে।
নচেৎ, বিধান ভবনের এই ভাঙচুর কেবল একটি দিনের ঘটনা হয়ে থাকবে না, এটাই হয়ে উঠবে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের পতনের স্থায়ী প্রতীক।
Advertisement



