বিশ্বজিৎ সরকার
বধিরকে জাগাতে গেলে সুউচ্চ গলার প্রয়োজন হয়। ফরাসি দার্শনিক বৈঁলিয়রের এই তত্ত্বকে সামনে রেখে দিল্লির আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন তিনি, সঙ্গী ছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত। স্যাণ্ডোস হত্যার মধ্যে দিয়ে লালা লাজপত রায় হত্যার বদলা নিয়েছিলেন তিনি। তিনি ভগৎ সিং, আর ভগৎ সিং বলতেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে পিস্তল, গুলি, লাঠি এবং ‘বদলাকা বদলার’ একটা ভাবমূর্তি। একটা উগ্র বিপ্লবী ইমেজ। নিঃসন্দেহে তিনি ভারতের অন্যতম বিপ্লবী।
Advertisement
হিন্দুস্থান স্যোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের এই বিপ্লবীর মতো বিপ্লবী খুব কমই আছেন। কিন্তু এটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি দার্শনিক, বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার মিশ্রণে এক স্থিতধী চিন্তাবিদ। বোমা নিক্ষেপের ঘটনার কথাই ধরা যাক। ১৯২৯ সালের ৮ এপ্রিল দিল্লি আইনসভায় ট্রেড ডিসপিউট বিল ও পাবলিক সেফটি বিলের প্রতিবাদে তিনি বোমা নিক্ষেপ করেন। অনেকের দৃষ্টিতে এটা ছিল সন্ত্রাসবাদী কাজ। কিন্তু স্মরণে আনা যাক সেই প্রেক্ষাপট। জাতীয় কংগ্রেস আত্মনিবেদনের পথে সমর্পিত, স্বাধীনতাস্পৃহা জাগাতে ব্যর্থ।
Advertisement
পূর্ণস্বরাজ ক্রমশ তাদের এজেণ্ডা থেকে অপসৃয়মান। এই ভাবনার বিপ্রতীপ চিন্তায় উঠেছে বিভিন্ন বিপ্লবী দল। ভগৎ সিংয়ের হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন চায় এমন একটি ঘটনা ঘটানো যা আসমুদ্র হিমাচলে সাহস জোগাবে এবং স্বাধীনতাস্পৃহা ছড়িয়ে দেবে জনগণের মনে। এই ভাবনা থেকে সেদিন করা হয় বোমা নিক্ষেপ। তাঁরা সেখানে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন যেখানে কোনও মানুষ ছিল না, বোমা নিক্ষেপের পর ‘ইনক্লাব জিন্দাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’, এই দুটি উচ্চারণ ছিল আসমুদ্র হিমাচল জাগানোর ঘটনা। বোমার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ইংরেজ এবং দেশীয় নায়কদের একটু আধটু কেউ আহত হয়েছিলেন।
এই ঘটনায় তিনি লেখেন— ‘মানুষের প্রতি ভালোবাসা আমাদের কারোর থেকে কম নয়। অতএব কোনও ব্যক্তির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের উদ্দেশ্য হলো কেন্দ্রীয় সংসদের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ প্রকটিত করা এই সংসদ প্রথমাবধি নিজের অস্তিত্বের অপ্রয়োজনীয়তায় প্রমাণ করেনি, বরং ক্ষতিকে বহুদূর ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিরই নগ্নপ্রকাশ ঘটিয়েছে। নিজেদের হৃদয় বিদীর্ণ করা ব্যথা প্রকাশ করার দ্বিতীয় কোনও পথ যাদের সামনে খোলা নেই, সেই সব মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিবাদ ধ্বনিত করার জন্যই আমরা সংসদ প্রাঙ্গণে বোমা নিক্ষেপ করেছি। আমার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বৃহত্তম সমাজের প্রতিধ্বনিত করা এবং যুগের প্রয়োজনকে যাঁরা উপলব্ধি না করে উপেক্ষা করছেন সচেতনতার বাণীকে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
এই ঘটনার পর গ্রেপ্তার হইয়ে যতবার তিনি ও বটুকেশ্বর দত্ত আদালত কক্ষে প্রবেশ করেছেন ততবারই আদালত কক্ষকে স্বাধীনতার মন্ত্রণাস্থল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যে নেতৃবৃন্দরা তাঁকে জেদী আপস-বিরোধী বলে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন, ছাত্রদের এক সমাবেশে এ ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য ছিল— ‘আপস এমন এক হাতিয়ার যা দীর্ঘ পথে পদে পদে ব্যবহার করতে হয়, তবে মনের মধ্যে সংগ্রামের আদর্শকে সর্বদাই জাগিয়ে রাখতে হয়। যে আদর্শের জন্য সংগ্রাম তার সাফল্য এবং ব্যর্থতা সম্পর্কে সঠিক বিশ্লেষণের মধ্যে ভবিষ্যতের কর্মসূচি নির্ধারণ করে এগিয়ে যেতে হয়। ১৬ আনা লড়াইয়ে এক আনা আদায় হলে পরবর্তী ১৫ আনার জন্য লড়াই শুরু করাটাই বিপ্লবী সংগ্রামী কর্তব্য’।
আবার তথাকথিত বিপ্লবীদের উদ্দেশে তাঁর সাবধানবাণী ছিল— ‘বিপ্লবের সঠিক ধারণা যদি না থাকে তবে দয়া করে থামুন। ইনক্লাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি তুলবেন না। এই শব্দটিকে যেমন তেমন ব্যবহার করতে দিতে আমরা পারি না’। মাত্র ২৩ বছর পাঁচ মাস পরমায়ু ছিল তাঁর। ১৯৩১ সালে ২৩ মার্চ তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। অবসর বলে তাঁর কাছে কিছু ছিল না। এমনকী জেলের মৃত্যু গহ্বরেও ছিল তাঁর কাছে থাকত টলস্টয়, ভলতেয়ার, চার্লস ডিকেন্স, গোর্কি, বান্ডার থেকে লেনিন, মার্কস, বাকুম ইন এমনকী রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল সম্ভার।
ইতিহাস বলছে, মৃত্যুর সময়ও যখন প্রহরী তাঁকে ফাঁসিকাঠের দিকে নিয়ে যেতে উদ্যত, তখন তিনি তার কাছ থেকে কিছু সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। কেননা লেনিন চরিত্রের কয়েকটা পাতা তাঁর পড়া বাকি ছিল। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষের তীব্র জ্ঞানতৃষ্ণা না থাকে, তাঁর মৃত্যু যে কোনও সংবেদনশীল মানুষের মনে হাহাকার তোলে।
কিন্তু তিনি কি শুধুই বিপ্লবী হয়ে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন? বোধহয় না, হাজার ভাগের এক ভাগ কাজও তিনি করে যেতে পারলেন না, এ আক্ষেপ তাঁর ছিল। সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর আবেদনে এটা স্পষ্ট, তিনি শুধু স্বাধীনতা চাননি, ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করে সাম্রাজ্যবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি পোষণ করতেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবন বড় পবিত্র। প্রত্যেকেই চায় পূর্ণ শান্তি স্বাধীনতা ও ব্যক্তিসত্তার বিকাশ। কিন্তু মানুষের দ্বারা মানুষের শোষণ যতদিন না বন্ধ হচ্ছে ততদিন পরিপূর্ণ স্বাধীনতা বিকাশ পরিপূর্ণ সম্ভব হবে না। এই শোষণমুক্ত সমাজের ভাবনা নিয়েই সম্পৃক্ত ছিল তাঁর চিন্তা। প্রতিটি বিপ্লবী কর্মকান্ডে তাঁর অবিরল আত্মানুসন্ধান তাঁকে স্থিতধী করেছে প্রতিনিয়ত।
উত্তরণের দিকে লক্ষ্য তাঁকে ঠেলেছে এই বৃহৎ কর্মকান্ডে। ব্যাপক মানুষের যোগদান যে বিপ্লবের অনিবার্য শর্ত, সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। লিখেছেন— ‘স্বাধীনতার সুফল যদি দেশের শ্রমিক কৃষকের মধ্যে ব্যাপ্ত না হয় সে স্বাধীনতা তার মূল আদর্শ থেকে ভ্রষ্ট হয়। এ ব্যাপারে তাঁর বলিষ্ঠ আবেদন ছিল— ‘আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে তাদের বোঝাতে হবে বিপ্লবটা তারই। বিপ্লব তারই কল্যাণের জন্য। বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মী সম্পর্কে তার উদত্ত আহবান ছিল— সান্ধ্য অবকাশে ভাষণ দেওয়া নেতা নয়। প্রয়োজনে সহিষ্ণুতা এবং আত্মত্যাগী উজ্জ্বল দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন।
কোনও প্রতিবন্ধকতায় যাঁরা নিরুৎসাহ নন। আমাদের দুর্ভাগ্য, নিষ্ঠুর মৃত্যু বড় তাড়াতাড়ি তাঁকে সরিয়ে নিল আমাদের থেকে। এরকম চিন্তা নায়ক বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীর অভাব আজ প্রকট।
Advertisement



