কোভিড-১৯ মহামারীর সময় নিয়মিত যে টিকাদানের কর্মসূচী থাকে তা অনেকটাই ব্যাহত হয়। বহু শিশু রুটিন টিকা না পাওয়ায় হাম বা রুবেলার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। ভারতে ২০২৪-২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক রোগ নির্মূল করার লক্ষ্যে টিকাকরণ কর্মসূচীর হার কমে যাওয়ায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট ও গুজরাত, কেরালা, ঝাড়খণ্ড, ও উত্তরপ্রদেশ থেকে হামের মতো সংক্রামক রোগ বাড়ছে যা শিশুদের জন্য অন্যতম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই মধ্যে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ায়।
বাংলাদেশের যশোর, খুলনা ও রাজশাহীর মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে সংক্রমণ বেশি করে ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে গত এক মাসে ১২ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। হাসপাতালে আইসোলেশন ও পর্যাপ্ত আইসিইউ বেডের অভাব পরিস্থিতিকে আরও সঙ্কটজনক করে তুলেছে বলে খবর। জানা গিয়েছে, চলতি মাসে ৮৪ জন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, কিন্তু ব্যবস্থা করা যায়নি। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, রাজশাহী ছাড়াও ঢাকা, ময়মনসিংহ, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবথেকে বেশি দেখা যাচ্ছে।
Advertisement
প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে। বিশেষ করে যশোর পশ্চিমবঙ্গের খুব কাছাকাছি হওয়ায়, সীমান্ত পার হয়ে সংক্রমণ আরও ছড়ানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি ও টিকাকরণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ভারতে সরকারি উদ্যোগে হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচী জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ মাস বয়সের শিশুদের জন্য এমআর টিকার দুটি ডোজ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। টিকা না হওয়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্কতা জারি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রক।
স্বাস্থ্য মন্ত্রক ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যকে সতর্ক করেছে এবং নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিতে সচেতনতা প্রচার চালানো হচ্ছে। অভিভাবকদের শিশুদের টিকা সম্পূর্ণ করানোর জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, অসুস্থ শিশুদের স্কুলে না পাঠানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল টিকাকরণ। জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির আওতায় শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাকরণে সামান্য গাফিলতিই বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে।
Advertisement
সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হাম টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৩৩ শতাংশ ৯ মাসের আগেই সংক্রমিত হয়েছে। অর্থাৎ কমবয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভারতেও বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়-সহ বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকা রাজ্যগুলিতে স্বাস্থ্য দপ্তরগুলি নজরদারি বাড়াতে শুরু করেছে। ভারতের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না করলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে হাম ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই আগে থেকেই শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শনাক্তকরণ ও আইসোলেশন ব্যবস্থার উপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচী, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সীমান্ত নজরদারি বাড়ানো না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
Advertisement



