নারী নিরাপত্তা জোরদার করতে শহরে দু’টি নতুন প্রক্রিয়া চালু করছে কলকাতা পুলিশ। ‘পিঙ্ক বুথ’ ও ‘শাইনিং’ নামে এই প্রকল্পগুলির কথা শনিবার সকালে ঘোষণা করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, শহরে কর্মরত ও রাত্রিবেলায় যাতায়াতকারী মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।
এ নিয়ে মমতা সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘শহরে মহিলাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কলকাতা পুলিশ দু’টি নতুন প্রকল্প চালু করছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়গুলিতে বসছে ‘পিঙ্ক বুথ’। এগুলি মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত হবে এবং শনিবার থেকেই প্রতি দিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চালু থাকবে। শহরে আমার বোনেরা যে কোনও সাহায্যের জন্য ‘পিঙ্ক বুথ’-এর মাধ্যমে মহিলা অফিসারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।’’
Advertisement
শনিবার সন্ধ্যা থেকেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে চালু হবে ‘পিঙ্ক বুথ’। সম্পূর্ণভাবে মহিলা পুলিশকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত এই বুথে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন মহিলা আধিকারিকেরা। মহিলারা যে কোনও সমস্যায় সরাসরি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। আপাতত শ্যামবাজার, কাঁকুরগাছি, উল্টোডাঙা হাডকো মোড়, গড়িয়াহাট ও বেহালা চৌরাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই বুথ চালু হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা, সিসিটিভি নজরদারি, প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর এবং অন্যান্য সহায়ক তথ্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে সেখানে। ভবিষ্যতে শহরের আরও জায়গায় এই পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
Advertisement
দ্বিতীয় উদ্যোগ ‘শাইনিং’—একটি বিশেষ মহিলা মোবাইল প্যাট্রল টিম। শনিবার রাত থেকেই এই বাহিনী শহরের রাস্তায় টহল দিচ্ছে। রাত ৮টা থেকে ২টো পর্যন্ত পাঁচটি গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নজরদারি চালাবে। বিশেষ করে যেসব পথে মহিলারা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরেন, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী টহলের সময়সীমা পরিবর্তন করা হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
মহিলা অফিসারদের টহলদারি বাহিনীগুলির নামকরণ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী নিজেই। নাম রাখা হয়েছে ‘শাইনিং’। লিখেছেন, ‘শনিবার রাত থেকে বিশেষ মোবাইল প্যাট্রল টিম ‘শাইনিং’ শহরের রাস্তায় ঘুরবে। রাত ৮টা থেকে ২টো পর্যন্ত তারা রাস্তায় থাকবে।’ পোস্টে তিনি আরও লিখেছেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে কলকাতা দেশের সবচেয়ে নিরাপদ শহরের তকমা পেয়ে আসছে। নতুন উদ্যোগগুলি সেই অবস্থানকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।’
সম্প্রতি পুলিশ কমিশনার পদে বদলের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। নতুন কমিশনার সুপ্রতিম সরকারের নেতৃত্বে নাকা চেকিং বৃদ্ধি ও রাত্রিকালীন তদারকি জোরদার হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নারী সুরক্ষায় ‘পিঙ্ক বুথ’ ও ‘শাইনিং’ প্রকল্প শহরের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কলকাতাকে আরও নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তুলতেই এই পদক্ষেপ বলে প্রশাসনের দাবি।
শনিবার কলকাতার পুলিশ কমিশনার স্বয়ং শ্যামবাজারে ‘পিঙ্ক বুথ’-এর উদ্বোধন করেন। তিনি জানান, নারী নিরাপত্তাই পুলিশের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বিশেষ করে কর্মরত মহিলারা যাঁরা গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন, তাঁদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে শহরের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ‘পিঙ্ক বুথ’ চালু হয়েছে—শ্যামবাজার, কাঁকুরগাছি, উল্টোডাঙা হাডকো মোড়, গড়িয়াহাট ও বেহালা চৌরাস্তা। বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সেখানে দায়িত্বে থাকবেন মহিলা পুলিশকর্মীরা। বুথগুলিতে প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ফোন, সিসিটিভি নজরদারি, মহিলা কর্মীদের পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা-সহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি থানার যোগাযোগ নম্বর, নিকটবর্তী হাসপাতালের তথ্যসহ বিভিন্ন জরুরি তথ্যও পাওয়া যাবে। কমিশনারের মতে, মহিলারা মহিলাদের কাছে নিজেদের সমস্যার কথা আরও স্বচ্ছন্দে ও নির্দ্বিধায় জানাতে পারবেন।দ্বিতীয় উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছে ‘শাইনিং মোবাইল’ টহলদারি ব্যবস্থা। পাঁচটি বিশেষ গাড়ি শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় রাত ৮টা থেকে ২টো পর্যন্ত টহল দেবে। প্রাথমিকভাবে সেই সব রাস্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যেগুলি মহিলারা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার সময় বেশি ব্যবহার করেন।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক ছবি বারবার সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাতে মেয়েদের একা বাইরে বেরোনো বা কর্মস্থল থেকে দেরিতে ফেরা নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা সর্বত্রই স্পষ্ট। রাজধানী দিল্লিতেও একাধিক ঘটনায় নারী সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে উত্তরপ্রদেশের নানা প্রান্ত থেকেও সময় সময় নারীদের উপর নির্যাতন বা হেনস্থার খবর শিরোনামে এসেছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তোলে।‘
তুলনামূলকভাবে কলকাতাকে অনেকেই মেয়েদের জন্য অপেক্ষাকৃত ‘নিরাপদ শহর বলে মনে করেন। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সমীক্ষায় এই শহর নিরাপত্তার বিচারে এগিয়ে থেকেছে। তবু সাম্প্রতিক আরজি কর কাণ্ড স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। সেই ঘটনা প্রশাসনের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে শহরে নারী নিরাপত্তা জোরদার করতে নেওয়া নতুন দুই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
Advertisement



