• facebook
  • twitter
Friday, 20 February, 2026

একুশে ফেব্রুয়ারি ও আত্মঘাতী বাঙালি

ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা, ডাব চিংড়ি আর সর্ষে ইলিশের উপর বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ও বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে না। যে কোনও জাতির মূল ভিত্তি হল তার ভাষা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

কাজল চট্টোপাধ্যায়

একুশে ফেব্রুয়ারি— আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সমগ্র দেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মানুষ এদিন নিজের নিজের মাতৃভাষা-কেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করেন।

Advertisement

ওপার বাংলা তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জ্বলে উঠে একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটিকে অমর করলেও; এপার বাংলার বাঙালিরা হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ না করে, পশ্চিমবঙ্গের বুকে ভূমিজ ভাষা বাংলার অবমাননা দেখেও না দেখার অভিনয় করে সম্পূর্ণ নীরবতাই উপহার দিয়ে গেছে— নিজেদের জাতীয়তাবাদ বা প্রাদেশিকতাহীনতা প্রমাণের লক্ষ্যে! তাই দশকের পর দশক একুশে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে কেবল এসেছে ও গেছে— আপামর বাঙালি কেবল ঘুমিয়ে থেকেছে বা বিহার-উত্তরপ্রদেশের ভাষাকে রাজভাষা রূপে গণ্য করে তার ভজনা করে চলেছে আদর্শ প্রজারূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে৷

Advertisement

একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে যদি কোনও প্রাদেশিক বাঙালি ভুলেও নিজের মায়ের ভাষার পক্ষ নিয়ে কোনও শব্দ উচ্চারণ করেও ফেলেন বা প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মহান সৃষ্টি ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গেয়ে ফেলেন, সমাজমাধ্যমে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের তখন দেখে কে! রে-রে করে তেড়ে এসে সে কি জ্বালাময়ী পোস্ট ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে, কখনও কখনও সংবাদপত্রের কলমেও! সহজেই উপলব্ধি করা যায় এই সমস্ত জাতীয়তাবাদীদের প্রকৃত মনোভাব— নিজেরাও বাংলার পক্ষ অবলম্বন করবো না; যে কতিপয় সংকীর্ণ প্রাদেশিক বাঙালির এখনও বাংলা-কেন্দ্রিক আবেগ ও ভালবাসা আছে, তাদেরও তা প্রকাশ করতে দেবো না৷
তাদের বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে অন্যতম— ‘সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ানো হয় কেন’৷ এই সমস্ত মহাপণ্ডিতদের কে বোঝাবে যে, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ আর বাংলা ভাষার প্রতি আবেগের মধ্যে ন্যূনতম বিরোধিতা নেই৷ আর তার সব চেয়ে বড় প্রমাণ খোদ এই প্রতিবেদক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেরই ছাত্র ছিল। তাও আবার পশ্চিমবঙ্গের বাইরে জন্ম ও জীবনের প্রথম তিন দশক সেখানেই অতিবাহিত৷ তা সত্ত্বেও বোধহয় ‘কিছুটা’ বাংলা জানা আছে৷ অন্তত ‘West Bengal’/ ‘পশ্চিমী বঙ্গাল’-এর আন্তর্জাতিক-জাতীয়তাবাদী বেঙ্গলি বা বঙ্গালিদের চেয়ে অনেকটাই বেশি জানা আছে৷ বাংলার বুকে জন্মে ও বাস করেও যাদের ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’, তারা নাকি বিহার, উত্তর প্রদেশ, ব্রিটেন, আমেরিকার ভাষাতে দারুণ সিদ্ধহস্ত৷

এই বাস্তবতাকে স্মরণে রাখতে হবে যে, বাংলা ভাষার আসল শত্রু ইংরেজি মাধ্যমও নয়, হিন্দি সাম্রাজ্যবাদও নয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুল দেশের সব রাজ্যেই আছে আর মহারাষ্ট্র গুজরাত, কর্ণাটক, কেরল, ওড়িশা, আসাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড সেই দেশেরই অংশ যার রাজধানী হল হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীদের তীর্থভূমি নতুন দিল্লি! তাহলে মারাঠি, গুজরাতি, কন্নড়, মালয়ালাম, ওড়িয়া, অসমিয়া, নাগা, মণিপুরী ভাষার নাভিশ্বাস উঠছে না কেন! পরিবর্তে প্রতিটি অ-হিন্দিভাষী রাজ্য সংশ্লিষ্ট ভূমিজ ভাষাকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

হ্যাঁ, বাংলা ভাষার শত্রু খোদ বাঙালিই— সেই আত্মঘাতী জাতি যারা নিজেদের জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিক মানসিকতার প্রমাণ দেওয়ার লক্ষ্যে নিজের মায়ের ভাষাকে পদদলিত করে হিন্দি ও ইংরেজির কাছে নিজেদের বাঙালিত্বকে বিক্রি করে ধন্য হয়েছে; রবীন্দ্রসঙ্গীত নজরুলগীতি বাউল ভাটিয়ালি বিসর্জন দিয়ে ভিন্ জাতির ভাষা সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে কৃতার্থ বোধ করছে৷

দক্ষিণ ভারত, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ওড়িশা, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুরে স্থানীয় ভাষাকে তাচ্ছিল্য করে হিন্দি আরোপ করলে আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, রেলদপ্তর, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বুক ফুলিয়ে বাংলা নিধন ও হিন্দি আরোপ করে যেতে পারছে কেবল ভূমিপুত্র বাঙালিদের আত্মঘাতী মননের জন্য, যারা বাংলার বুকে বাংলা ভাষার নিদারুণ অপমানে অপমানিত না হয়ে নির্লজ্জের মতো হিন্দির ভজনা করে বর্তে যাচ্ছে৷

হ্যাঁ, এই প্রতিবেদক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই পড়াশোনা করেছে, পুত্রও পাঠ করেছে ইংরেজি মাধ্যমেই। কিন্তু এই অধমের মতো বাংলার হয়ে লড়াইটাও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে হাতে গোনা কিছু মানুষই করে থাকে৷ এই উগ্র হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতার যুগে বিহার, উত্তর প্রদেশের ভাষা আরোপ প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ ছাপার অক্ষরে করাটা কোনও ছেলেখেলা নয়। কখনও পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থা, কখনও কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের উদ্দেশে সরাসরি পত্রের মাধ্যমে সংঘাতে গেছি— ‘কোন্ স্পর্ধাতে আপনারা পশ্চিমবঙ্গের বুকে ভূমিজ বাংলা ব্রাত্য করে বিহার-উত্তরপ্রদেশের ভাষা আরোপ করেন’৷

আমি অত্যন্ত জোর দিয়ে প্রশ্ন করতে পারি, ক’জন বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা বাঙালি এই হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, বাংলা নিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন৷ ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করা খোদ সমালোচকরা কখনও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নিধনের প্রতিবাদ করেছেন! নাহলে এই সমস্ত অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করতেন না— ‘সন্তান কোন্ মাধ্যমে পড়াশোনা করে’! বা ‘আমি বাংলায় গান গাই’-এর অনুরাগীদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন না!

অনাবশ্যকভাবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলকে শূলে না চড়িয়ে সমালোচকদের উচিত সিংহভাগ বাঙালির এই পর-কে অনুকরণ করার দাসত্ব বৃত্তির প্রতিবাদ করা আর তারই সঙ্গে কেন্দ্র সরকার ও বেসরকারি সংস্থাদের বাংলা বিদ্বেষী মনোভাবের বিরুদ্ধে সরব হওয়া। যদি নিতান্তই ব্যঙ্গ করতে হয়, তাহলে সেই সমস্ত তথাকথিত বাঙালিদের ব্যঙ্গ করা উচিত যারা সারা বছর হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি, গুজরাতি তামিল, তেলুগু (হ্যাঁ এখন তামিল তেলুগু ছবি দেখে নিজের ‘উদারতা’ দেখানোর হুজুগ এসেছে!) ইংরেজির পদলেহন করে কেবলমাত্র অষ্টমীর দিনে ধুতি শাড়ি পরিধান করে পুষ্পাঞ্জলি দেন আর পয়লা বৈশাখে কবজি ডুবিয়ে রেস্তরাঁতে ‘Bangali Thali’ সেবন করেন৷

ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা, ডাব চিংড়ি আর সর্ষে ইলিশের উপর বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা ও বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে না। যে কোনও জাতির মূল ভিত্তি হল তার ভাষা। যে জাতি নিজের ভূমিতে নিজের ভাষা যত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবে; তাদের শক্তি ঠিক ততটাই বৃদ্ধি পাবে, তাদের ভবিষ্যৎও ততটাই পুষ্ট হবে।

ভেলোর শহরে দেখেছি, রাজ্য সরকারি অফিস, পৌরসভা সর্বত্র কেবল একটাই ভাষা দৃষ্টিগোচর—তামিল-তামিল-তামিল৷ বিহার-উত্তরপ্রদেশের ভাষা তো দূর অস্ত, ইংরেজিও প্রায় অদৃশ্য। অপরপক্ষে খোদ পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহরে বিভিন্ন রাজ্য সরকারি দপ্তরের নামফলকে তো ভাষার ছয়লাপ। উত্তর ভারতের হিন্দি, উর্দু, ব্রিটেনের ইংরেজির সঙ্গে কোনোক্রমে এক স্থানে করুণভাবে ভূমিজ বাংলা!

খড়্গপুরের এক রাজ্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছবিতে যে নামফলক দেখলাম, তা আবার কেবলমাত্র তেলুগু ভাষাতে৷ আর ঠিক এই কারণেই তো তামিলনাড়ুর বুকে তামিল ভাষা বা তামিল জাতি তথা সংস্কৃতির অপমান করার স্পর্ধা না আছে কেন্দ্রের হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীদের, না আছে সে রাজ্যে করে খাওয়া কোনও বেসরকারি সংস্থার, না আছে কোন বহিরাগত গোষ্ঠীর৷ অপর পক্ষে উদার ‘পশ্চিমী বঙ্গালে’র সর্বত্র কী অনায়াসে কেন্দ্রের হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীরা, বেসরকারি সংস্থাসমূহ ও বহিরাগত গোষ্ঠীরা বাংলা ভাষা ও বাঙালির অবমাননা করতে পারে৷

তাই একু​শে ফেব্রুয়ারিতে সমগ্র দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে যে মুষ্ঠিমেয় প্রকৃত বাঙালি নিজের মায়ের ভাষার প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাদের সমালোচনা না করে যাদের ‘বাঙালিত্ব’ দুর্গাপুজো ও পয়লা বৈশাখের চর্বচোষ্য গলাধঃকরণের মধ্যে আরম্ভ ও শেষ হয়, তাদেরই তীব্র সমালোচনা
করা উচিত।

Advertisement